বেঙ্গালুরু থেকে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো নিয়ে তুলকালাম

ভারতের বেঙ্গালুরু প্রদেশে বাংলাদেশি সন্দেহে আটক ৫৯ জনকে ফেরত পাঠানো নিয়ে স্থানীয় প্রশাসনে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। গত শুক্রবার থেকে সোমবার সন্ধ্যা; তিন দিন পরও আটককৃতদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি প্রশাসন। উল্টো বেঙ্গালুরুতে ২৬ দিন আটক থাকার পর এবার পশ্চিমবঙ্গের হাওড়ায় কড়া পুলিশি নজরদারিতে আটকে রাখা হয়েছে তাদের।

মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গের বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার এক প্রতিবেদনে বলছে, ওই ৫৯ জনের খাওয়া-থাকার খরচ কোথায় থেকে আসবে, তা নিয়ে বেজায় সমস্যায় পড়েছে হাওড়া জেলা প্রশাসন। সমস্যায় রাজ্য প্রশাসনও। আটককৃতদের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট নীতি নির্ধারণ এখনও করতে পারেনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সচিবালয় ভবন নবান্ন। এর মধ্যেই পুরো বিষয়ে জানতে চেয়ে নবান্নের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কলকাতার বাংলাদেশ উপদূতাবাস। ফলে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে লম্বা সময় লাগবে বলে ধারণা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের।
নবান্নের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার বলছে, কর্নাটক সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারকে চিঠি দেয়া হয়েছিল ওই ৫৯ জনকে রাজ্যের হাতে তুলে দেয়ার বিষয়ে। রাজ্য প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, কর্নাটক সরকারের পক্ষে জানানো হয়েছিল, তারা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে। রাজ্য পুলিশ ওই ৫৯ জনকে তুলে দেবে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে।

কিন্তু ওই ৫৯ জন পৌঁছানোর পর সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনও প্রতিক্রিয়া পায়নি রাজ্য পুলিশের কর্মকর্তারা। রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রাখার দায়িত্ব রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের সীমান্ত শাখার। সেই সমন্বয়ের অভাবে রেল পুলিশের ওপর দায়িত্ব পড়ে ওই ৫৯ জনকে রাখার।

পুলিশ বলছে, এতজনকে রাখার মতো কোনও ব্যবস্থা রেল পুলিশের ছিল না। হাওড়া কমিশনারেটের হাত ঘুরে পুরো বিষয়টি পৌঁছায় হাওড়ার সাংসদ প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে।

জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার দাবি, সাংসদ জানিয়েছিলেন ইডেনে পিঙ্ক বল টেস্ট দেখতে বাংলাদেশের অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করতে। জেলা প্রশাসনের অন্য এক কর্তা বলেন, ফোনটা এসেছিল সন্ধ্যায়। তড়িঘড়ি বালি জগাছার ব্লক ডেভেলপমেন্ট অফিসার অসিত বরণ ঘোষ নিশ্চিন্দা থানার ইনস্পেক্টরকে সঙ্গে নিয়ে ওই স্বনিযুক্তি কেন্দ্রে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা করেন।

স্বনিযুক্তি কেন্দ্রের তিন তলার ছয়টি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। বালিশ-বিছানা খাবার সবই বন্দোবস্ত করে ব্লক প্রশাসন। পর রাতে ওই ৫৯ জন পুলিশ প্রহরায় আসার পর জানা যায় আসল ঘটনা। ৫৯ জনকে এক ভবনে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে ওই এলাকার আরও একটি জায়গায় থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে প্রায় ২০ জনের।

জেলা প্রশাসন জানে না, কতদিন তাদের রাখতে হবে বা খাওয়া দাওয়ার জন্য কোন খাত থেকে খরচ করা হবে। এ বিষয়ে অসিতকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংসদ প্রসূন বলেন, আমার কাছে বিষয়টা এসেছিল। আমি থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আমার এলাকায় কেউ এলে যাতে ভালোভাবে থাকেন সেটাই চেষ্টা করি। তবে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে আটক জেনেই তিনি ব্যবস্থা করেছিলেন কিনা তা নিয়ে কোনও কথা বলেননি সাংসদ।

নবান্ন বলছে, বাংলাদেশ উপদূতাবাসও খোঁজ নেয়া শুরু করেছে এ বিষয়টি নিয়ে। উপ-দূতাবাস সূত্রের বরাত দিয়ে আনন্দবাজার বলছে, তাদের কাছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের চিঠি আসে। সংবাদ মাধ্যমেও প্রকাশ্যে আসে ‘পুশ ব্যাক’ বিষয়টি। এ নিয়ে খোঁজ খবর শুরু করতেই কর্নাটক সরকার পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে যে চিঠি দিয়েছিল তা ফরওয়ার্ড করা হয়েছে উপদূতাবাসকে। ফলে যাদের বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তারা বাংলাদেশি কিনা তা খতিয়ে দেখবেন বাংলাদেশের কূটনীতিকরাও।

সেই সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন মাসুমের পক্ষে ‘পুশ ব্যাক’র বিরোধিতা করে চিঠি দেয়া হয়েছে দেশটির জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকেও। গত অক্টোবরে বিভিন্ন সময়ে ওই ৫৯ জন বাংলাভাষীকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি হিসাবে চিহ্নিত করে বেঙ্গালুরু পুলিশ। তাদের সেখানকার একটি হোমে ২৬ দিন আটক করে রাখা হয়।

পরে সরকারি স্তরে স্থির করা হয় আটককৃতদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে যাকে প্রশাসনিক পরিভাষায় বলে ‘পুশ ব্যাক’। ২২ নভেম্বর ওই ৫৯ জনকে অন্ধ্রপ্রদেশের প্রশান্ত নিলয়ম স্টেশন থেকে হাওড়াগামী ট্রেনের একটি আলাদা কোচে বেঙ্গালুরু পুলিশের ৪০ জনের নজরদারিতে রওয়ানা করা হয়। পরের দিন হাওড়া স্টেশনে ট্রেন পৌঁছালে বেঙ্গালুরু পুলিশ রাজ্য সরকারের রেল পুলিশের হাতে তাদের তুলে দেয়।

আরও