ইসি সচিবালয় তুমি কার?

চার কমিশনার সিইসিকে চিঠি লিখেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ইসি সচিবালয় তুমি কার? সিইসির নাকি সিইসিসহ ৫ কমিশনারের।
জ্যেষ্ঠ ইসি মাহবুব তালুকদার সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সিইসি নিরুত্তর। তবে পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলছেন ভিন্ন। তারা বলছেন, তাহলে বিগত নির্বাচনগুলোতে ইসি সচিবালয় চলেছে কার নির্দেশে? নির্বাচনী দায়িত্ব পালনরতরা কে কত ভাতা পেয়েছিল, সেটা কমিশন ঠিক করেনি? নাকি করেছেন সিইসি একাই? কারণ সিইসি ও জ্যেষ্ঠ সচিবের দাবি শুধু নির্বাচন বিষয়ে কমিশনারদের বলার আছে। কারো নিয়োগের বিষয়ে কমিশনারদের বলার ক্ষমতা নেই। কারণ এই ক্ষমতা কেবলই সিইসির।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রতীয়মান হয় যে, সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের বিধানাবলীর মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন সিইসি ও জ্যেষ্ঠ সচিব। এই দুজনের দাবি, ইসি সচিবালয় চালানোর ক্ষমতা সিইসির।

এতে কমিশনারদের হাত নেই। চারশর কম কর্মী নিয়োগে চার কোটির বেশি টাকা খরচের অবিশ্বাস্য ঘটনায় সিইসি বনাম চার ইসির আইনি লড়াই চলছে। এর আগেও এক রাউন্ড এমন ঘটেছিল। কিন্তু এবারের পর্বে আর্থিক অনিয়ম বা অপচয়ের বিষয় জড়িত।

সিইসিকে লেখা চিঠিতে সই করেছেন মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ বলেছে, নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব পালনে স্বাধীন হবেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ বলেছে, কমিশন ইসির সকল বা আংশিক দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা সিইসি বা কমিশনার বা কোনো কর্মকর্তার কাছে ন্যস্ত করতে পারে।

১১৮ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কমিশন স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নিমিত্ত নির্বাচন কমিশন আইন ২০০৯ প্রণীত হয়েছে । নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নির্বাচন কমিশন (কার্যপ্রণালী) বিধিমালা ২-১০ জারি করেছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ এর ৪(১) ধারায় ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয় নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয় সকল সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবে এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তার ওপর আরোপিত অন্যান্য যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করবে’ মর্মে উল্লেখ রয়েছে।

৪(১) ধারায় বর্ণিত দায়িত্ব ছাড়াও নির্বাচন কমিশনকে সার্বিক সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে সচিবালয় যে সকল দায়িত্ব পালন করবে তা ৪(২) ধারা এবং বিধিমালা ২০১০ এ বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০১০ এর ৫ (১) ধারায় ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে ন্যস্ত থাকবে মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই আইনের ১৪(১) ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদনের জন্য সচিব প্রধান নির্বাচন কমিশনার এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের নিকট দায়ী থাকবেন।’

আইনের ১৪(২) উপধারা মোতাবেক ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, নির্বাচন কমিশনের সার্বিক নিয়ন্ত্রণে, সচিবের নিকট দায়ী থাকিবেন…।’
২০০১ সালের নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইনের ১৬ ধারায় বর্ণিত আছে, ‘নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য অনুমোদিত বাজেটে নির্ধারিত খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় অনুমোদনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হইবেন।’
নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও মাঠ পর্যায়ের কার্যালয়ের ১২তম গ্রেড হতে ২০তম গ্রেডভুক্ত শূন্যপদে কর্মচারী নিয়োগ সংক্রান্ত অনিয়মের ওপর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে তার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ১৪ই নভেম্বর ২০১৯ তারিখের সভায় সকল নির্বাচন কমিশনার, সিনিয়র সচিব ও অতিরিক্ত সচিব উপস্থিত ছিলেন।

সভায় আলোচনার একপর্যায়ে একজন নির্বাচন কমিশনারের প্রশ্নের উত্তরে সিনিয়র সচিব কমিশনকে জানান যে, বর্ণিত নিয়োগের বিষয় এবং তৎসংক্রান্ত ব্যয় নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ার বহির্ভূত। বিষয়টি সিইসিও সমর্থন করেন। সিনিয়র সচিব আরো অবহিত করেন যে, বিদ্যমান আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়াদি কমিশনের অনুমোদনের প্রয়োজন আছে।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অন্যান্য বিষয়াদি সিইসির অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন।

চিঠিতে আরো লেখা হয়, নির্বাচন কমিশনের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় গঠিত। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন কমিশনের সার্বিক নিয়ন্ত্রণে অর্পিত দায়িত্ব পালন করিবেন এবং সচিব প্রধান নির্বাচন কমিশনার এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের নিকট দায়ী থাকিবেন।
সিনিয়র সচিবের বক্তব্য ও বর্তমান অবস্থায় ১৪(২) উপধারা অনুযায়ী সচিবালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নির্বাচন কমিশনের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ অনুপস্থিত। তারা শুধুমাত্র সচিব ও সিইসির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কমিশনের নিয়ন্ত্রণের কোনো মেকানিজম বা সুযোগ থাকছে না।

খ) নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের জন্য অনুমোদিত বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় অনুমোদনের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ হইবেন। বরাদ্দকৃত অর্থ যে সকল খাতে ব্যয় হবে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়াদি কমিশনের এখতিয়াভুক্ত। এবং কমিশন কর্তৃক অনুমোদন আবশ্যক। মাঝেমধ্যে নির্বাচন প্রশিক্ষণ সংক্রান্ত কোন কোন বিষয় উপস্থাপন করা হলেও অন্য কোনো আর্থিক বিষয়ে কমিশনকে অবগতও করা হয় না। যা নির্বাচন কমিশন আইন ২০০৯ এর ১৬ ধারার সুস্পষ্ট লংঘন।

গ) নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ এর ধারা ৪সহ অন্যান্য ধারায় বর্ণিত কমিশনের উপর অর্পিত সকল কার্যাদিতে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে কমিশনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। তদুপরি সচিবালয় এককভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, তা ২০০৯ সালের ১৪ই নভেম্বর তারিখের সভায় সিনিয়র সচিব তুলেও ধরেছেন। যা সংবিধান, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ ও সংশ্লিষ্ট বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ঘ) নির্বাচন কমিশন সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনের সকল বিষয়ে সংবিধানসহ বিদ্যমান সকল আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে নির্বাচন কমিশনের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বিঘ্নিত হবে। একইসঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। নিম্নস্বাক্ষরকারী কমিশনারগণ উপরের বিষয়সমূহ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নিকট তুলে ধরে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশনারগণকে অবহিত করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানাচ্ছে।

আরও