পক্ষকালব্যাপী বিজয়ের কথা বলতে অন্যস্বরের ‘দ্রোহ এনেছে বিজয় ৭১’ হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব

আমাদের অতীত ঐতিহ্যের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের আমৃত্যু দায়। এই পতাকার জন্য কপাল পুড়েছিল হরিদাসির, এই আমাকে জটরে ধরে সীমাহীন কষ্ট করে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন আমার; মা বিন্দুবাসী। বাবা তখন মুজিব নগর সরকারের আওতায় মেঘালয়ের বালাট আহত মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রের আহবায়ক। জানি ইতিহাসে যা কখনোই লেখা হবে না। হয়তো মায়ের গর্ভে আমার কান তৈরি হয়ে গিয়েছিল; তাই জয় বাংলা বুকের ভিতর জ্বেলে দেয় আগুন। এই পতাকার জন্যে কাফন বেঁধে সম্মুখ সমরে লড়েছেন আবাল বৃদ্ধ বনিতা। ইয়াহিয়া খাঁ আর তার দোসরদের গনহত্যার বিভৎস রুপ দেখে শিওরে উঠেছিল মানবতা। “মনে হবে সে তো কোন সীমানায়/আমরা কোথায়। কী করে বা একে ছুড়ে দেই ফেলে এত যে বেদনা রাখি দূরে ঠেলে/ দেবে না তোমরা ক্ষুধিতকে রুটি সামান্য দুটি মানুষকে সহায়তা দাও”।
বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে রবিশংকরের সেতারের সুর জর্জ হ্যারিসনের গায়কী, আল্লা রাখা তবালার বুল, আলী আকবর খানের সারোদ আর কমলা চক্রবর্তীর তানপুরায় মানবতার সুরে-সুরে পাশে চেয়েছিলেন বিশ্ববাসীকে আর অহংকারের লাল সবুজের আগমনী বার্তার জানান দিয়েছিলেন উত্তর আমেরিকার নিউইয়র্কের ম্যেডিসন স্কয়ারে। হে ত্রিশ লক্ষ শহীদ, আঁধার তারানিয়ার মত মানুষ তখনো জেগেছিল। শুধু জেনে যাও মৃত্যুর নদী পেরিয়ে রক্তের স্রোতে তোমরা গেলে ভেসে, ১৬ ডিসেম্বর ৭১ তোমাদের রেখে যাওয়া পতাকা আমরা এখন ওরাই বিশ্বময় তোমাদেরি ভালবেসে।
৫৬ হাজার বর্গমাইল ছাড়িয়ে বারো হাজার কিলোমিটার দুরে অভিবাসী আমরা। লাল সবুজের পতাকা নিয়ে ভিন্ন এক শীতের দেশে, ভিন্ন সংস্কৃতি, বৃষ্টি ভিন্ন,কৃষ্টি ভিন্ন। আমাদের কর্মব্যস্ততা, আমাদের বিল পরিশোধ,সন্তানদের নিয়ে আমাদের উচ্চাকাঙ্খা, টাইম ইজ মানি আর মানি ইজ টাইমের এই শহরে থেকেও আমাদের মাথায় ৭৯ হাজার গ্রাম আর হৃদয় ছুঁয়ে আছে তেরোশত নদী। দ্রোহ আমাদের সেই চির পুরাতন যা জ্বলিয়ে দিয়েছিল বুকের ভিতর সময়ের ডাক-এবারের সংগ্রাম; আমাদের হাজার বছরের দ্রোহ  দীর্ঘজীবী হউক আমাদের কর্মে।
৪৯তম বিজয় দিবসকে সামনে রেখে, কর্মব্যস্ত অথচ মনে প্রাণ বাউল কিছু মানুষের সংগঠক আলোকবাহী সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব আহমেদ হোসেনের সংগঠন অন্যস্বর। আমরা সিদ্ধান্ত নেই পক্ষকালব্যাপি বিজয়ের কথা কইবো,বিজয়ের গান গাইবো। “দ্রোহ এনেছে বিজয় ৭১”। ডে কেয়ার সেন্টারে সারাদিন পরের বাচ্চা সামলিয়ে, নিজের কোলের বাচ্চা নিয়ে সাড়া দিতে আসে রিফাত সাথে রিমি পক্ষকালব্যাপি এই আয়োজনের দুই সমন্বয়ক। মহড়া শুরু হয় দলনেতা আহমেদ হোসেন এর নেতৃত্বে। সার্বিক তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব নেন মনির বাবু। ক্লান্তির ক্ষমা নেই শান্তার কাছে ভালবেসে গেয়ে যায় দেশের গান। আসে শেখ নাহার, জুলিয়া, ফারিহা লাকি, ফাইরুজ, সিনথিয়া, দিলারা নাহার বাবু আর হাসি তোমাদের সত্যি ভালবাসি। শিরিন যার চোখের গভিরতায় সবুজ দেখা যায়, সে সবুজে স্নেহ -সুষমায় বাঙালিয়ানাতে বেড়ে উঠছে তাঁর আর আনোয়ারের ছেলেটি সুষ্ময়। ছয়দফা -এগারো দফা না জানা মনুমিয়া যেমন পক্ষির মতো পাকি নিধন করেছিল আর বাংলা পড়তে না পাড়া আমাদের সুষ্ময় অবলিলায় গেয়ে দেয় ও আমার বাংলাদেশ প্রিয় জন্মভূমি। রুমানার সাথে আসিফ কালাচাঁদ বাবরি চুলের “সহসা আমারে চিনিয়াছি আজ খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”। সময়ের নিষেধ নেই মুক্তির কাছে, সহযোগীতার রিং টোন রাত বিরাতে যখনই বাজুক সে জেগে আছে।
আমরা অন্যস্বর আমরা জেগে আছি। আমাদের দ্রোহের উচ্চারণে কবিতায় প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয় ১লা ডিসেম্বর “দ্রোহ এনেছে বিজয় ৭১” চলবে ১৬ তারিখ পর্যন্ত। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আমাদের শাসন করতে পারেনি। তুষার ঝড় কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন শব্দ সৈনিক ভালবাসার কবি দ্রোহের কবি, অপরাজেয় গোঁফ আর মুখে বিজয়ের হাসি নিয়ে কবি আসাদ চৌধুরী। ১৯৭১ এ তাঁর কলম আগুন জ্বেলেছিল কাব্যে সেই থেকে আজকের দিন পর্যন্ত তিনি বাংলা বর্ণমালা, বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ঘুরেছেন দেশে দেশে, এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন বাংলার সংস্কৃতিকে। স্বাধীনতার ৪৯ পঞ্চাশ বছর পরেও তাঁর দ্রোহের আগুন ১লা ডিসেম্বরের তুষার ঝড় ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। আমাদের সবাইকে নিয়ে তিনি এই বিজয় পক্ষের উদ্ভোদন করেন। অনুষ্ঠান শেষে কবি কন্ঠে শোনান তাঁর বন্ধুবর কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা। ছোট্ট স্থানটিতে কতজনই বা বসতে পারে তবু প্রতিদিন দেশপ্রেমের দ্রোহাঞ্জলিতে সামিল হয়েছেন অনেকেই আরো হবেন ১৬ তারিখ পর্যন্ত। ত্রিশ লক্ষ শহিদের চেতনার রেণুরা, তোমরাতো ছিলে প্রথম দিন আছো প্রতিদিন তবু জেনে যাও পরিচয়ে আমরা বাঙালি, কারো সাধ্য নেই আমাদের ইতিহাসের প্রগতি রুদ্ধ করে, আমরা গাইবো গাইবো বিজয়েরই গান; ছড়িয়ে দেবো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

হিমাদ্রী রয় সঞ্জীব
সাংস্কৃতিক কর্মী

আরও