লাখো শহীদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবো না: প্রধানমন্ত্রী

 প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ভাষা আন্দোলনের জন্য রক্ত দিয়ে যারা রক্তের অক্ষরে আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন, তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। লাখো শহীদের সেই আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না, বৃথা যেতে পারে না। আমরা বৃথা যেতে দেবো না- এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা। এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। মুজিববর্ষ সফল ও সার্থকভাবে আমরা উদযাপন করব।

শনিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলেছি। বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে নয়; আমরা প্রযুক্তিগত শিক্ষাকেও গুরুত্ব দিয়েছি। দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি আমরা প্রযুক্তিকেও এগিয়ে নিতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে আমরা প্রযুক্তির ব্যবহার ও ইন্টারনেট সার্ভিস দেওয়া থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন সব কিছু ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছি। অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার সঙ্গে প্রযুক্তিগত জ্ঞান নিয়ে সারাবিশ্বে একটা সম্মানিত জাতি হিসাবে গড়ে তুলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলবো; যে বাংলাদেশের স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন একটা জাতি হিসেবে বাঙালি জাতিকে আমরা গড়ে তুলতে চাই। ভাষা শহীদ ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবো না।

বক্তব্যের শুরুতে বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে এই আন্দোলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিস্মরণীয় অবদান তুলে ধরে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, একসময় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকেও বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা চলেছিল। অথচ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেই বঙ্গবন্ধু ভাষার অধিকার রক্ষার দাবিতে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। ওই বছরের ১৬ মার্চে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আমতলায় ছাত্র-জনতার যে সমাবেশ হয়েছিল- সেখানে সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ওই সভায় বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ১৭ মার্চ ছাত্র ধর্মঘটও পালিত হয়েছিল।

তিনি বলেন, এরপর দেশের বিভিন্ন জেলায় জেলায় সভা-সমাবেশ করার সময় ১৯৪৯ সালের ১১ জুন ফরিদপুর থেকে গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু। পরে বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করা হলেও কারাগারে থেকেই নির্দেশ পাঠিয়ে ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন তিনি।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ হচ্ছে এই উপমহাদেশের একমাত্র ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। সেটা প্রতিষ্ঠা করেছেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখনই তার সিদ্ধান্ত ছিল- পাকিস্তানের সঙ্গে আর নয়। অর্থাৎ ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু। ভাষার অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকেই ধাপে ধাপে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। আর ধীরে ধীরে দেশের মানুষকে সংগঠিত করে লড়াই-সংগ্রামের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করেছেন বঙ্গবন্ধু।

তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে মনোনিবেশ করলেন। কিন্তু পাকিস্তানের দোসররা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিলো। তারা ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করলো। কিন্তু ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। সে কথা আজ প্রমাণ হয়েছে।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর অত্যাচার-নির্যাতনের মুখেও আওয়ামী লীগের লড়াই-সংগ্রামের বিবরণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, পঁচাত্তরের পর ২১টি বছর জাতির পিতার নাম মুছে ফেলা হয়েছিল। আমরা ক্ষমতায় আসার পর তা আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এসে আবারও মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারেনি। সবচেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পালন করতে পারছি। ২০২১ সালের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীও আমরা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ই পালন করবো।

তার সরকারের টানা ১১ বছরে দেশ ও জাতির কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করার অঙ্গিকার পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, আমরা স্বাধীন জাতি। সবচেয়ে বড় কথা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ আজ ক্ষমতায়। জাতির পিতার নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ মর্যাদা ও সম্মান পাচ্ছে। দেশকে আমরা উন্নয়নের রোলমডেলে পরিণত করেছি।

দৃঢ়কণ্ঠে তিনি বলেন, বাংলাদেশের একটি মানুষও যেন গৃহহারা না থাকে। যারা গৃহহীন তাদের আমরা ঘর করে দেবো। প্রত্যেক মানুষের একটা ঠিকানা হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে চলেছি। যে বাংলাদেশ এক সময় ছিল দুর্ভিক্ষের দেশ, দুর্যোগের দেশ, দারিদ্র্যের দেশ- সেই বাংলাকে কেউ এখন দারিদ্র্য, দুর্যোগপূর্ণ ও ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত দেশ বলতে পারবে না।

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন- আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ডেনভারের অর্থনীতির শিক্ষক ও লেখক-গবেষক অধ্যাপক হায়দার আলী খান, আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, কার্যনির্বাহী সদস্য মেরিনা জামান কবিতা, ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী প্রমুখ।

এ সময় ভাষা শহীদদের স্মরণে কবিতা আবৃত্তি করেন কবি তারিক সুজাত। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এবং উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

 

আরও