হত্যার পর তিন দিন তোশকে মুড়িয়ে রাখেন স্বামীর লাশ

 রতন নামে ব্যবসায়ী এক বন্ধুকে বাসায় নিয়ে আসেন আবদুর রহমান। মদপানের পর ওই বন্ধুর হাতে চতুর্থ স্ত্রী সামিরা আক্তারকে তুলে দেন তিনি। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠায় সামিরার গালেমুখে চড়থাপ্পড় দিয়ে ঘুমিয়ে যান রহমান। পরে ঘুমন্ত স্বামীকে দা দিয়ে গলা কেটে হত্যা করেন সামিরা। হত্যার পর স্বামীর মরদেহ তোশক ও বিছানার চাদর দিয়ে ঢেকে পাশের কক্ষে রেখে ঘুমিয়ে যান। এভাবে তিন দিন কাটান সামিরা।

শ্রীপুর পৌরসভার প্রশিকা মোড় এলাকায় ভাড়া ফ্ল্যাটের ওই কক্ষে খাটের ওপর লাশ রেখে তিন দিন পর সামিরা বাইরে তালা দিয়ে পালিয়ে যান। ঘটনার ১৪ দিন পর সোমবার রাতে গ্রেপ্তারের পর র্যাবের কাছে হত্যার রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

র্যাব-১ এর গাজীপুর পোড়াবাড়ী ক্যাম্পের ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, জমি ব্যবসায়ী স্বামী আবদুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পুরো ঘটনা র্যাবকে জানিয়েছেন সামিরা। তবে এ সময় তার মধ্যে কোনো অনুশোচনা কাজ করেনি।

জানা যায়, তিন তলা ভবনের দোতলায় তালাবদ্ধ একটি ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। মানুষ পচা গন্ধ। সময় যত বাড়তে থাকে, বিশ্রী গন্ধের তীব্রতা ততই বাড়তে থাকে। আশপাশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল ওই দুর্গন্ধে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ওই ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পুরো শরীর ঝলসানো, গলা কাটা অবস্থায় বিছানার চাদরে মোড়ানো অর্ধগলিত লাশটি উদ্ধার করে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মজনু মিয়ার আবাসিক ভবন থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়।

হত্যার শিকার আবদুর রহমান শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর গ্রামের নছিম উদ্দিনের ছেলে। গত ১৪ জানুয়ারি সামিরা তার মাকে নিয়ে ওই ভবনের দোতলার পূর্ব পাশের একটি ফ্ল্যাট ৯ হাজার টাকায় ভাড়া নেন। তার দ্বিতীয় স্বামী রহমানকেও নিয়ে আসেন বাসায়।

র্যাব জানায়, সামিরাকে গ্রেপ্তারের পর তিনি নিজেই হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। র্যাবকে জানান, এ পর্যন্ত রহমান তার আটজন বন্ধুর হাতে তাকে তুলে দিয়ে যৌন নির্যাতন করিয়েছে। সংসার ত্যাগ করতে চাইলেও তাকে সেটি করতে দেয়নি। অত্যাচার থেকে রক্ষার জন্য স্বামীকে তিনি হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। হত্যার পর তিনি আট পৃষ্ঠার একটি চিঠি লেখেন গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপারের কাছে। অবশ্য সে চিঠি পুলিশ সুপারকে পাঠানোর সুযোগ হয়নি।

র্যাব জানায়, সেই চিঠিতে হত্যার কারণ উল্লেখ করেছেন সামিরা। তবে চিঠিতে লেখা সব কথা সত্য নয়। নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যার পর পুরো শরীরে অ্যাসিড ঢেলে দেন সামিরা। দা দিয়ে গলায় প্রথম কোপ দেওয়ার পরপরই রহমান হাউমাউ করে ওঠে। এ সময় কম্বল দিয়ে তার মুখ চেপে ধরা হয়। লাশ গুম করার পথও খুঁজেছিলেন সামিরা। কয়েক বন্ধুর সহযোগিতাও চেয়েছিলেন।

হত্যার এ ঘটনায় নিহত রহমানের প্রথম পক্ষের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম একটি মামলা দায়ের করেন। এর পরই র্যাব-১ এর সদস্যরা সামিরাকে খুঁজে বের করতে মাঠে নামেন। অবশেষে সোমবার রাতে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকায় অভিযান চালিয়ে সামিরা ও তার বাবা আলী হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পোড়াবাড়ী র্যাব ক্যাম্পে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ক্যাম্প ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল মামুন এ হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার মৃত ফজলুল হকের ছেলে আলী হোসেন গাজীপুরের জয়দেবপুর এলাকার ছামিদুলের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। সামিরা বিপথে চলে যাওয়ার কারণে তার সঙ্গে বাবার সম্পর্কও ভালো যাচ্ছিল না। তবে এ ঘটনার পর সামিরা তার বাবার আশ্রয় চান এবং তার আশ্রয় থেকেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জানা যায়, ২০১৬ সালে রহমান দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে গাজীপুর নগরীর টঙ্গীতে বাস করতেন। সামিরা টঙ্গী সরকারি কলেজের ডিগ্রি পরীক্ষার্থী ছিলেন। দুজন পূর্বপরিচিত হওয়ায় রহমানের বাসায় থেকে পরীক্ষা দিতেন সামিরা। সামিরা জানান, এ সময় তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় রহমান।

এরপর কৌশলে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করে। একই সঙ্গে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করা হয়। পরে ধর্ষণের ভিডিও এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে দিনের পর দিন চলে ধর্ষণ। ওই ধর্ষণের ভিডিও প্রকাশ পেলে সামিরাকে তার প্রথম স্বামী তালাক দেন।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে সামিরাকে বিয়ে করেন রহমান। র্যাব জানায়, বিয়ের পর থেকে রহমান তার ব্যবসায়িক স্বার্থে, আবার কখনও টাকার বিনিময়ে ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে স্ত্রীকে যৌন কাজে লিপ্ত হতে বাধ্য করত। যৌন নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে ডিভোর্স চাইলে সামিরাসহ তার মা-ভাইকে হত্যার হুমকি দেয় রহমান।

 

আরও