খেলাপিদের সর্বোচ্চ সুবিধা দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক

খাতা-কলমে খেলাপি ঋণ কমাতে গত বছরজুড়ে গণছাড়সহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়। এই সুযোগে ঋণখেলাপিদের ব্যাপকহারে সুবিধা দিয়েছে সরকারি ব্যাংকগুলো। তবে এককভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছে বেসরকারি খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। গত বছর ব্যাংকটি ১১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। ইসলামী, জনতা, সোনালী, বেসিক, অগ্রণী ও রূপালী এই ৬টি ব্যাংকের খেলাপিরাই মোট পুনঃতফসিলের ৪৬ ভাগ সুবিধা নিয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, গত ২০১৯ সালে ব্যাংকগুলো সর্বমোট ৫২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। এর মধ্যে আলোচ্য ছয়টি ব্যাংক করেছে ২৪ হাজার ১৯২ কোটি টাকা।

গত বছর শেষে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমান দাঁড়িয়েছে ৯৪ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগ (ঋণ) করেছে ৯০ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা। গত বছর ঋণ খেলাপিদের সুবিধা দিতে ১১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে নবায়ন করেছে। আগের বছর পুনঃতফসিল করে ৭ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। পুনঃতফসিল সুবিধা প্রায় ১৩ শতাংশ বাড়লেও খেলাপি ঋণ কমাতে পারেনি ব্যাংকটি। গত বছর শেষে খেলাপি হয়ে গেছে ৩ হাজার ৪১৮ কোটি টাকা।

আগের বছর খেলাপি ৩ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুনঃতফসিল করেছে খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা জনতা ব্যাংক। গত বছর ব্যাংকটি ৫ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। আগের বছর করে ১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে পুনঃতফসিল বাড়িয়েছে চারগুণ। এর পরও বছর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা।

আগের বছর দেশের শীর্ষস্থানীয় ঋণগ্রহীতার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে সোনালী ব্যাংক। যার ফলে ২০১৮ সালে ব্যাংকটি পুনঃতফসিলকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা। গত বছর শেষে যা হয়েছে ১ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে ঋণ ডাকাতিতে সর্বস্বান্ত বেসিক ব্যাংক। আগের বছর পুনঃতফসিল সুবিধা দেয় ১ হাজার ২৮৬ কোটি টাকার। এরপরও ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৫২ দশমিক ৫৯ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে ব্যাংকটির।

খেলাপিদের সুবিধা প্রায় তিনগুণ বাড়িয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ২০১৯ সালে খেলাপিদের ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিল করে দিয়েছে ব্যাংকটি। আগের বছর পুনঃতফসিল করে ৬৬৬ কোটি টাকার খেলাাপি ঋণ।

সরকারি মালিকানাধীন আরেক ব্যাংক রূপালী ২০১৮ সালে পুনঃতফসিল করে ৯১১ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ। আর গত বছর করেছে ১ হাজার ৯৯ কোটি টাকার। গত বছর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে যা ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলো ২২ হাজার কোটি খেলাপি ঋণ কমিয়েছে।

মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে বর্তমান সরকার দেশ-বিদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। তাই খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কয়েকটি কাগুজে উপায় বের করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর যে পরিমাণ প্রকৃত খেলাপি ঋণ থাকার কথা, তার তুলনায় অনেক কম দেখানো হাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর কাগুজে আয়-মুনাফা বাড়ছে এবং তারল্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর দুর্বলতা সাময়িকভাবে আড়াল হলেও কাঠামোগত দুর্বলতা আরও প্রকট হচ্ছে; কিন্তু দেশের জনগণের জমাকৃত আমানত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ছাড় দিয়ে পুনঃফতফসিল, সুদ মওকুফ ও অবলোপনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো হচ্ছে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঋণগ্রহীতার পকেট থেকে টাকা ব্যাংকের ভল্টে ফেরত আসছে না; কিন্তু ব্যাংকের আয় বাড়ছে বলে দেখানো হচ্ছে। ফলে অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলো থেকেই যাচ্ছে। প্রকৃত তথ্য আড়াল করার ফলে দুর্বলতা চোখে পড়ছে না। সুশাসন নিশ্চিত করে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

 

আরও