প্লাস্টিক কোনো সমস্যা নয়, প্লাস্টিক হলো সম্পদ

সাম্প্রতিক বিশ্বে সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয় ও পরিবেশ দূষণের প্রধাণ নিয়ামক প্লাস্টিক। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষই এক সময় এই প্লাস্টিক আবিষ্কার কওে কিন্তু প্লাস্টিকের অব্যবস্থাপনাযুক্ত ব্যবহার ক্রমেই পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাড়িয়েছে।

শিল্পায়ন ও নগরায়নের পাশাপাশি তাল মিলিয়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কিন্তু ইতিহাস বিবেচনায় দেখা যায় যে প্লাস্টিকের আবিষ্কার খুব পুরোনো নয়। ১৯৪৫ সালের দিকে আবিষ্ক্রিত হয় প্লাস্টিক এবং ১৯৫০ এর দিকে এর উৎপাদন ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ টন।

কিন্তু ২০১৫ সালে সে পরিমাণ দাড়ায় ৪৪৮ মিলিয়ন টন। পৃথিবীতে এখন প্রতি বছর মাথাপিছু ৬০ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। আমরা প্রতিনিয়ত প্লাস্টিক ব্যবহার করছি এবং প্রয়োজন শেষে তা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছি কোনো ব্যবস্থাপনা ছাড়াই। আমাদেও এই অসচেতনতার
জন্যই দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। তবে আশার কথা হলো উন্নত দেশগুলো এই প্লাস্টিক বিপর্যয় থেকে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে আসছে এবং তার পাশাপাশি প্লাস্টিকের বিকল্প সন্ধান করছে। কিন্তু চিন্তার বিষয় হলো আদৌ কি প্লাস্টিকের কোনো টেকসই ও সহজলভ্য বিকল্প রয়েছে?

প্লাস্টিকের যেমন খারাপ দিক রয়েছে তেমনি কতিপয় ভালো দিকও রয়েছে। সুলভ ও টেকসই মান এবং পরিবেশে সহজে পঁচে না এজন্য দৈনন্দিন ব্যবহারে প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজে পাওয়া মুশকিল। বিল্ডিং ও নির্মাণ কার্য থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, পরিবহন, বৈদ্যুতিক ও শিল্প এমনকি বিভিন্ন খাবারের মোড়ক এরকম সকল ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের আধিপত্য চোখে পরে। সময়ের সাথে সাথে প্রতিদিনের কাজেকর্মে প্লাস্টিকের ব্যবহার বহুমূখী, সাস্থকর ও নিরাপদ হয়ে উঠছে। বিভিন্ন প্রকারের প্লাস্টিক পণ্য মানুষের জীবনকে আরও সহজ করে তুলছে। শক্তিশালী, লাইটওয়েট আমাদের জীবনযাপনের মান কীভাবে উন্নত কওে তুলছে তা নিয়ে অনেকেরই কোনো ধারণাই নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে
প্লাস্টিকের বিচরন ও ব্যবহার দেখলেই জানা যাবে দৈনন্দিন জীবনে এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু।

প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের বহুবিধ ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। নির্মাণ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। প্লাস্টিকের রয়েছে দুর্দান্ত বহুমূখীতা, স্থায়িত্ব, ক্ষয় প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং তার পাশাপাশি এর নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণের প্রয়োজন পরেনা এজন্য এসব কাজে প্লাস্টিকের বিকল্প খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নির্মাণক্ষেত্রে প্লাস্টিক মূলত সীল, দরজা জানালার প্রোফাইল, পাইপ, বৈদ্যুতিক কেবল এবং নিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও প্লাস্টিক এত বেশি ব্যবহারের কারণ হিসেবে বলা যায় এগুলো পঁচে না, মরিচা পড়ে না বা নিয়মিত মেরামতের প্রয়োজন পরে না।

হালকা ওজনের জন্য এরা সহজে বহনযোগ্য এবং সহজেই এদেরকে স্থানান্তরিত করা যায়। এসব কারণে নির্মাণ কাজে প্লাস্টিকের চাহিদা অনেক। প্লাস্টিকের ওজন কম ও টেকসই হওয়ায় পরিবহন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দেখা যায়। যেকোনো যানবাহনের যদি ওজন কমানো যায় তবে তার জ্বালানি বাবদ খরচ অনেকাংশে কমে যায়। তাই গাড়ি, বিমান, নৌকা প্রভৃতি যানবাহনে প্লাস্টিক ব্যবহার করলে এবং যানবাহনের ওজন কমিয়ে ফেললে জ্বালানি খরচ নাটকীয়ভাবে কমতে পারে। প্লাস্টিকের সল্প ওজনের জন্য পরিবহন শিল্পে এর ব্যবহার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এছাড়া যানবাহনে বাহ্যিকভাবে ব্যবহৃত প্লাস্টিকগুলি খুবই টেকসই হয়, সহজে ক্ষয় হয় না এবং খুবই সামান্য রক্ষনাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। আর যানবাহনের ড্যাশবোর্ড ও আসনের মতো ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার তাদের আকর্ষনীয় করে তোলে এবং পরিষ্কার করা সহজ। পরিবেশ সুরক্ষা ও গতির চাহিদা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থাগুলি যেমন বিকশিত হয়েছে, পরিবহন খাতে প্লাস্টিকের ব্যবহার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। পরিবহন ছাড়াও প্লাস্টিকের আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার দেখা যায় বিদ্যুৎ বা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রে। আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা
বিদ্যুতের ব্যবহার দেখি এবং যেখানেই বিদ্যুৎ পাই সেখানেই প্লাস্টিকের ব্যবহার দেখা যায়।

বসার ঘরে টেলিভিশন বা কাজের সময় ব্যবহৃত কম্পিউটার, ফ্যাক্স মেশিন বা টেলিফোন সবখানেই প্লাস্টিকের দেখা মিলে। এমনকি বৈদ্যুতিক বিভিন্ন সরঞ্জামাদী যেমন, বৈদ্যুতিক তারের কোটিং, ইনসুলেটর, বৈদ্যুতিক বাতি, সুইচ ইত্যাদি থেকে শুরু করে বড় বড় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি তৈরিতেও প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক বৈদ্যুতিক পণ্যগুলিকে নিরাপদ, হালকা, আরও আকর্ষনীয় ও সুলভ করে তোলে। এছাড়াও প্লাস্টিকের ব্যবহার আমরা এখন সবচেয়ে বেশি যে ক্ষেত্রে দেখছি তা হলো খাবার প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায়। প্লাস্টিকের প্যাকেজিং এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে কারণ প্যাকেজিং এর অন্যান্য পদ্ধতিগুলো তুলনামূলক ব্যয়বহুল।

প্যকেজিংয়ে প্লাস্টিক উপযুক্ত উপাদান যার কারণ হতে পারে প্লাস্টিকগুলো বহুমূখী, লাইটওয়েট, নমনীয় এবং অত্যন্ত টেকসই আর পাশাপাশি এর দামও তুলনামূলক কম। প্লাস্টিকের প্যাকেজিং অনেকটাই হাইজেনিক এবং ময়লা ও জীবাণু থেকে খাবারকে সহজে রক্ষা করতে পারে।
বিশ্বব্যাপী অসংখ্য প্যাকেজিং কাজে প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন ধরণের বোতল, পাত্র, ড্রাম, ট্রে, কাপ
ইত্যাদি বিভিন্ন পণ্য তৈরিতেও প্লাস্টিকের গুরুত্ব রয়েছে।

এখন খুঁজে বের করা মুশকিল হবে যে কোন ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার নেই? চিকিৎসাক্ষেত্রের কথা বলা হলেও বলতে হয় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা প্লাস্টিক সামগ্রীর ব্যবহার ছাড়া সম্ভবই হতো না। কেননা প্লাস্টিকের প্রয়োগ চিকিৎসা ও জনসাস্থ্যের জন্য অবিশ্বাস্য। ওষুধ রাখার বোতল
এমনকি সিরিঞ্জের টিওব থেকে শুরু করে একটি উন্মুক্ত এম.আর.আই মেশিনের আবরণ পর্যন্ত প্লাস্টিকের তৈরি।

চিকিৎসাক্ষেত্রে প্লাস্টিকের ব্যবহার স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজতর করে তুলেছে। তদুপুরি, খেলাধুলার সামগ্রী থেকে আমাদের নিত্য ব্যবহার্য পণ্যগুলির প্রায় সবই ধাতু ও ফাইবারের পরিবর্তে প্লাস্টিকের সাথে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। আধুনিক সমাজ অনেকাংশেই প্লাস্টিকের উপর নির্ভরশীল যা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর ব্যবহার দেখলেই বোঝা যায়। কারও কারও যুক্তি হতে পারে যে প্লাস্টিক ছাড়া আধুনিক সমাজের উন্নয়ন সম্ভব হতো না। এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ও অযাচিত ব্যবহার পরিবেশকে দূষিত করছে কিন্তু তার সাথে এটাও বলতে হবে প্লাস্টিক ছাড়া আধুনিক জীবন কল্পনা করা মুশকিল। সাধারণ কিছু কৌশল অবলম্বন করেই আমরা প্লাস্টিক দূষণ থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি, একক ব্যবহার্য বা সিঙ্গেল-ইউস প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, প্লাস্টিক পণ্যের পুনঃব্যবহার ইত্যাদি পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সরকারও প্লাস্টিকের ব্যবহার সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন পণ্যে প্লাস্টিকের বা পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষনা করে পাটের মতো পণ্যের ব্যবহার করতে জনগনকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কিন্তু প্লাস্টিকের ব্যবহার যে হারে ছড়িয়েছে সে তুলনায় এসব ব্যবস্থা নেয়া একেবারেই অপ্রতুল। বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রতি মিনিটে প্রায় ৩৩,৮০০ টি প্লাস্টিকের বোতল সাগরে গিয়ে পড়ছে। বছরে যার পরিমাণ প্রায় ৮০ লাখ টন।

এমন চলতে থাকলে হয়তো ২০৫০ সাল নাগাদ দেখা যাবে যে মাছের তুলনায় সাগরে প্লাস্টিকের পরিমাণ বেশি। এমন অবস্থায় অনেক পরিবেশবাদী প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করার ডাক দিচ্ছেন। যাইহোক, কিছু বৈশিষ্ট্য যা প্লাস্টিককে এত বিপজ্জনক করে তোলে – প্লাস্টিকের স্থায়িত্ব, টেকসই মান ও দীর্ঘ আয়ু এটিকে একটি দুর্দান্ত সম্পদ হিসেবেও মূল্যায়ন করতে আমাদের বাধ্য করে। এমন একটি সম্পদ যা পাঁচশত বছরেও ধ্বংস হয় না এবং আমরা যা অবিরামব্যবহার করতে পারি তা অবশ্যই মূল্যবান।

সুতরাং, বলতে হবে সমস্যা প্লাস্টিকের নয়। সমস্যা হলো এটি দায়িত্বহীনভাবে ব্যবহার করার অর্থাৎ যারা প্লাস্টিকের ব্যবহার করে এবং ব্যবহার শেষে যত্রতত্র ফেলে দেয় তাদের জন্যই পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। মানবতাকে উপলব্ধি করতে হবে যে, আমাদের বর্তমান পদচিহ্নের প্রেক্ষিতে, সবকিছুই পুনর্ব্যবহার করা সবচেয়ে জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ। এইমুহুর্তে আমরা পরিবেশগত উদ্বেগগুলি পূরণ করাকে বাধ্যবাধকতা হিসাবে বিবেচনা করি।

কিন্তুআমাদের বোঝা উচিত এগুলি কোনো বাধ্যবাধকতা নয়, বরং আমাদের জীবন এসবের উপর নির্ভর করে। উন্নয়ণ ও অর্থনীতি সম্পর্কে আমাদের ধারণাগুলো আমাদেরকে এই বাস্তবতা থেকে সরিয়ে নিয়েছে। আমাদের জীবনে আমরা যা করতে পারিনা তা যদি না করি তবে কোনো সমস্যা নেই। তবে যা আমরা করতে পারি তা না করলে আমরা বিপর্যয়। প্লাস্টিক আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এটা আমাদের প্রয়োজন।

কিন্তু যা আমাদের প্রয়োজন নয় তা হলো প্লাস্টিক বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণ। তাই পরিবেশ দূষণের বিষয়টি মাথায় রেখে প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহারে আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্লাস্টিকের জন্য যেন পরিবেশ দূষিত না হয় সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। মানুষের সচেতনতাই পারে প্লাস্টিকের কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণ কমাতে এবং সুন্দর দূষণমুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলতে।

লেখিকা: শিক্ষাথী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আরও