১২ ব্যাংক মূলধন হারিয়ে ধুঁকছে

সঠিক নিয়মাচার পরিপালন না করে ঋণ বিতরণ করায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়েই চলেছে। এই সম্পদের বিপরীতে আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুসারে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকগুলোর আয় থেকে অর্থ এনে এই মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়; কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ১২টি ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যাংকগুলোর ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। ঘাটতিতে পড়া ১২টি ব্যাংকের মধ্যে সরকারি ব্যাংকই ৭টি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়- গত ২০১৮ সালে মূলধন ঘাটতিতে পড়া ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ১০টি। এবার ঘাটতিতে পড়েছে ১২টি ব্যাংক। সবচেয়ে বেশি ৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের। আগের বছর ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৮ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। এক বছরে ব্যাংকটির ঘাটতি বেড়েছে ৫৬৪ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘাটতি রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালীর। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এই ব্যাংকের ঘাটতির পরিমাণ ৫ হাজার ৩২০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে গত বছর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা।

মূলধন ঘাটতির শীর্ষ তিনে রয়েছে আরেক সরকারি ব্যাংক জনতা। অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ জালিয়াতির অকুস্থল এই ব্যাংকের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। যদিও আগের বছর ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ৮৮৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা। অবিশ্বাস্যভাবে কমেছে বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি।

ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতিতে কমেছে নীতিগত কিছু ছাড়-সুবিধা গ্রহণ করে। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে দেখানো হয়েছে ৯৬১ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ঘাটতি ৭১২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮৮ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রূপালী ব্যাংকের মূলধন আগের বছর ২০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকলেও গত বছর শেষে ঘাটতি হয়েছে ২০০ কোটি টাকা।

সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতির ব্যাখায় এ ব্যাংকগুলো দাবি করে আসছে, সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি অনেক আগে থেকেই; কিন্তু এই খাতের ব্যাংকগুলো অন্তত ৪০টি সেবা বিনা চার্জে প্রদান করে। সরকারের বড় প্রকল্পের কার্যক্রমে কোনো কমিশন নেয় না। এসব নিলে কোনো ঘাটতি থাকত না। তবে মূলধন ঘাটতি পূরণে ব্যাংকগুলোর মালিক সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকগুলো।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি হয়েছে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের। আগের বছর ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৩৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৮৯ কোটি টাকা। মালিকদের দুর্নীতির জন্য সবচেয়ে বেশি আলোচিত পদ্মা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হয়েছে ৭৭ কোটি টাকা। বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের মূলধন ঘাটতি ৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৬২ কোটি টাকা।

এবার মূলধন ঘাটতির তালিকায় নাম রয়েছে নতুন কার্যক্রমে আসা কমিউনিটি ব্যাংকের। পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি হয়েছে দেড় কোটি টাকা। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মশিউল হক চৌধুরী বলেন, ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ব্যাংকটি যাত্রা শুরু করে। ব্যাসেল-৩ নীতিমালার ক্যালকুলেশনে সামন্য ঘাটতি হয়েছে। তবে আমাদের মূলধন পর্যাপ্তের হার অনেক বেশি, ১৫০ শতাংশ।

ব্যাংকগুলোর শেয়ারহোল্ডার বা মালিকদের জোগান দেওয়া অর্থই মূলধন হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি, সেই পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অনেক ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মূলধন রাখায় সামগ্রিক খাতে মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে। ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলোর ১০ লাখ ৪৭ হাজার ২২৪ কোটি টাকা ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে ১ লাখ ৭ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। ব্যাংকগুলো সংরক্ষণ করেছে ১ লাখ ২১ হাজার ১৩৪ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে ১৩ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে।

 

আরও