ইতালিতে লকডাউনের দিনগুলো

বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ করোনাভাইরাস, কোয়ারেন্টিন এবং লকডাউন। শব্দ তিনটির বানান কিংবা আভিধানিক অর্থ না জানা মানুষের মধ্যেও শব্দ তিনটির ব্যবহার এখন নিয়মিত। প্রিয় বাংলাদেশেও শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে রাস্তার পাশের চায়ের দোকানের আড্ডায় সর্বত্রই শব্দগুলো এখন খুবই চেনা। কারণ হয়তো গণমাধ্যমে ব্যাপক সংবাদ প্রচার। এ ছাড়া ইতিমধ্যে বাংলাদেশে করোনায় মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সারা দেশে সাধারণ ছুটি চলছে এবং বিদেশফেরত ও তাঁদের সংস্পর্শে আসা মানুষকে কোয়ারেন্টিন করা হচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলো সরকার ঘোষিত ছুটি এবং কোয়ারেন্টিনকে জোর করে বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাস্তবায়নকারী সংস্থার মাধ্যমে। কেননা মানুষ এখনো করোনা মহামারি সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করছেন না। জনগণ হয়তো মনে করছেন সরকারের সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তা লক্ষ করা যাচ্ছে।

ইতালির মানুষ ও সরকারও শুরুতে গুরুত্ব দেয়নি করোনাভাইরাসকে। চীনে যখন করোনা সংক্রমণের ভয়াবহ অবস্থা চলছিল, তখনো দিব্যি ইতালিতে মানুষ আনন্দ-ফুর্তিতে মেতেছে, নানা উৎসব চলেছে। চীনসহ নানা দেশ থেকে ভ্রমণ ও কাজের জন্য মানুষ এসেছে। তখন তাদের সুরক্ষাব্যবস্থা চোখে পড়েনি। এমনকি দেশের কর্তাব্যক্তিরা, স্বাস্থ্য বিভাগ কেউ প্রস্তুতি নেয়নি শুরুতে। যখন সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে, তখন জনগণ গায়ে মাখেনি, তারা ভেবেছে তাদের কিছু হবে না এ সামান্য ভাইরাসে!

শেষমেশ করোনা আর সামান্য থাকেনি এবং ইতালি তার নির্বুদ্ধিতার মাশুল দিয়ে যাচ্ছে অদ্যাবধি। ইতালিতে লকডাউনের তিন সপ্তাহ হয়ে যাচ্ছে। এই লকডাউনে অবশ্য মানুষ আইন মেনে চলছে। না মেনে উপায় কী! কারণ মানুষ করোনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরেছে খুব ভালোভাবেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কঠোর, বিনা প্রয়োজনে বাইরে বেরোলে দুই শতাধিক ইউরো জরিমানা। আর কপাল খারাপ হলে জেলও হতে পারে। পুলিশ বিভাগ থেকে সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য দিয়ে ফরম দেওয়া হয়েছে। কেউ বাইরে গেলে পূরণ করা ফরম সঙ্গে রাখতে হবে, পুলিশ দেখতে চাইলে দেখাতে হবে। ওষুধ, স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, জরুরি সেবাদানকারী এবং খাদ্য সরবরাহ/বিক্রয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাদে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাসায় থেকে দাপ্তরিক কাজ করার, যাকে বলা হয় ওয়ার্ক ফ্রম হোম। অনলাইনেই অফিস করছে মানুষ। কেবল যেসব কাজ বাসায় বসে বা অনলাইনে করা সম্ভব নয়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অফিসে যাচ্ছেন প্রমাণাদিসহ।

এখানে লকডাউনের শুরুতেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। জরুরি কোর্সগুলোর ক্লাস অবশ্য অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সে চালিয়ে নেওয়া হয়েছে। আমি যে ক্যাম্পাসে আছি সেখানেও লকডাউন চলছে। গত এক মাস ডরমেটরিতে থাকা, ভেতরের ক্যানটিনে খাওয়া আর ক্যানটিনের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ইতালির দীর্ঘতম নদী পো দেখা ছাড়া ক্যাম্পাসের বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বাইরের মানুষেরও ক্যাম্পাসে প্রবেশের সুযোগ নেই। ক্যানটিনে খাবারের টেবিল দূরে দূরে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পো নদীতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে কায়াকিং করতে দেখো যেত। এখন সব বন্ধ। শান্ত নদীটিও যেন কোয়ারেন্টিনে আছে। কোর্স সমন্বয়ক, শিক্ষকদের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ রক্ষা করতে হচ্ছে। বাইরের খবরও মূলত টেলিফোনে, টেলিভিশনে, অনলাইন সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পেতে হচ্ছে।

এখানে আইন প্রয়োগ যেমন কঠিন আবার নাগরিকেরাও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। নাগরিকেরা সরকারি নির্দেশনা মেনে চলছেন। প্রতিদিন স্থানীয় সময় ছয়টা বা তারপর ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের আক্রান্ত, মৃত ও সুস্থ মানুষের তথ্য প্রকাশ করা হয়। দেশটিতে রিপোর্টিং সিস্টেম ভালো এবং নাগরিকদের কাছে সঠিক তথ্য প্রকাশ করা হয়। মাঝে মাঝে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন বা নতুন ঘোষণা জারি করেন। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ চলছে যেন পুরো জাতির। এখানে করোনার প্রতিপক্ষ দেশের সব নাগরিক। চিকিৎসকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবু অদ্যাবধি মৃতের সংখ্যা কমছে না। গত দুএক দিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী নতুন করে সংক্রমণের হার কমছে। সম্ভবত ইতালি কঠোর লকডাউনের ফল পেতে শুরু করেছে।

আর্থিকসহ নানা কারণে পুরো বাংলাদেশকে লকডাউনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এত সহজ না হলেও সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। সারা দেশ ছুটি ও কোয়ারেন্টিন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেমে দেখা যাচ্ছে এখনো অনেক মানুষ অকারণে বাইরে যাচ্ছেন, করোনা নিয়ে তাঁদের অসচেতনতা এবং গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই এমনটি ঘটছে। তবে তাঁদের এ অবহেলা অন্য মানুষের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। সরকারের একার পক্ষে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যদি মানুষ সচেতন না হয়।

বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট ইউরোপের দেশগুলোর চেয়ে উন্নত নয়। ইউরোপের দেশগুলোই যেখানে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে করোনা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়লে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে, তা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে। অথচ মানুষ যদি সরকারের নির্দেশনা মেনে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করে চলেন এবং কোয়ারেন্টিন পালন করেন, তাহলে সহজেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এটি এখনো না বুঝলে ভবিষ্যতে কোনো সান্ত্বনাই কাজে আসবে না।

 

আরও