ভারতে করোনা ছড়ানোর ক্ষেত্রে তাবলিগ জামাতের দায় কতটা?

ভারতে গত রোববার পর্যন্ত যত মানুষের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে, তার ৩০ শতাংশই তাবলিগের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। দিল্লিতে গত মাসে তাবলিগ জামাতের বিতর্কিত ধর্মীয় সমাবেশটি দেশটিতে একাই করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি করছে সরকার। আর এ জন্য গোটা দেশে অন্তত ২২ হাজার তাবলিগ সদস্য ও তাদের কন্ট্যাক্টদের কোয়ারেন্টিনে রাখতে হয়েছে।

তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলছেন, দেশে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য তাবলিগকে ঢালাওভাবে দায়ী করা ঠিক হবে না। কারণ তারা ওই সময় সমাবেশটি করে দেশের সে সময় জারি থাকা কোনো আইন ভাঙেনি। তাদের গাফিলতি থেকে থাকলে সরকারের ব্যর্থতাও কম নয় বলে তারা মনে করছেন।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে জানানো হয়, ভারত সরকার বলছে, রোববার বিকেলে দেখা গেছে ভারতে করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের হার দ্বিগুণ হয়েছে মাত্র ৪.১ দিনে। অথচ তার আগে এই হার দ্বিগুণ হতে সময় লাগছিল ৭.৪ দিন।

প্রায় সাড়ে সাত দিন থেকে কমে এসে এই যে মাত্র চার দিনের মাথায় রোগীর সংখ্যা ভারতে দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে-এর জন্য ভারত সরকার একটি নির্দিষ্ট ইভেন্টকেই দায়ী করছে। আর সেটি হলো দিল্লির মারকাজ নিজামুদ্দিনে গত মাসে তাবলিগ জামাতের সমাবেশ।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব লাভ আগরওয়াল বলেন, রোববার পর্যন্ত সারা দেশে যে সোয়া তিন হাজারের মতো করোনা সংক্রমিত রোগী শনাক্ত হয়েছিল, তার মধ্যে ১ হাজার ২৩ জনই কোনো না কোনোভাবে তাবলিগ জামাতের সাথে সম্পর্কিত।

লাভ আগরওয়াল বলেন, গোটা দেশের ৩০ শতাংশ কেসই এই এমন একটি ঘটনার সাথে সম্পর্কিত, যেটি আমরা বুঝতেও পারিনি বা সামলাতে পারিনি।

তাবলিগের ক্ষেত্রে যেটা আরও বড় সমস্যা হয়েছে-তা হলো জামাত ফেরত হাজার হাজার মুসল্লি ট্রেনে, বাসে বা প্লেনে করে ভারতের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং রাস্তায় বা বাড়িতে ফিরেও তারা বহু লোকের সংস্পর্শে এসেছেন।

এদের মধ্যে বেশ কয়েকশো বিদেশি নাগরিকও ছিলেন, তারাও অনেকেই ভারতে চিল্লা বা ধর্মীয় প্রচারে বেরিয়ে পড়েছিলেন।

ফলে তাবলিগের সঙ্গে করোনাভাইরাসের যোগসূত্রর সন্ধানে ভারতে যে মাপের ম্যানহান্ট বা কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং করতে হয়েছে তা প্রায় নজিরবিহীন।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তা পুণ্যা শ্রীবাস্তব বলেন, রোববার পর্যন্ত সারা দেশে বিরাট এক অভিযান চালিয়ে মোট ২২ হাজার তাবলিগ কর্মী ও তাদের কন্ট্যাক্টদের চিহ্নিত করে তাদের কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। এই সংখ্যা অবশ্যই আরও বাড়বে-তবে আমরা আশা করছি এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সফলভাবে লকডাউন প্রয়োগ করে আমরা কোভিড ছড়ানোর শৃঙ্খলকে ভাঙতে পারব।

তবে ভারতের বিশিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞ এবং হায়দারাবাদের নালসার ইউনিভার্সিটি অব লর উপাচার্য ড. ফায়জান মুস্তাফা মনে করেন, ভারতে ভয়ংকর গতিতে করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য একতরফাভাবে তাবলিগ জামাতকে অভিযুক্ত করা ঠিক নয়।

তার গবেষণা বলছে, তাবলিগ দেশের কোনো আইন ভাঙেনি। তিনি আরও মনে করেন, যেকোনো কথিত অপরাধের তদন্তে ঘটনার তারিখ খুব গুরুত্বপূর্ণ-আর এই তাবলিগের ঘটনাও তার ব্যতিক্রম নয়।

ড. মুস্তাফার কথায়, তারিখগুলো ভালো করে খেয়াল করুন। ১৩ মার্চ ভারতে যখন করোনাভাইরাস পজিটিভ কেস ৮১টি, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তরফে লাভ আগরওয়াল জানাচ্ছেন, দেশে কোনো হেলথ ইমার্জেন্সি তৈরি হয়নি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের উপসর্গ রয়েছে এমন মুসল্লিদের তাবলিগ জামাতের সদরদপ্তর থেকে বাসে করে সরিয়ে নিয়ে আইসোলেশনে রাখা হয়।

ওই একই দিনে দিল্লি সরকার একটি নির্দেশ জারি করে রাজধানীতে সেমিনার ও কনফারেন্স নিষিদ্ধ ঘোষণা করে-তবে সেখানেও ধর্মীয় সমাবেশের কোনো উল্লেখ ছিল না।ফলে ১৩ মার্চেও কিন্তু দিল্লিতে ধর্মীয় সমাবেশের অনুমতি ছিল-আর তাবলিগ তাদের জামাতের আয়োজন করেছিল ১৩ থেকে ১৫ মার্চ।

অমৃতসরে শিখদের স্বর্ণমন্দির, কিংবা হিন্দুদের তিরুপতি, সিদ্ধিবিনায়ক, বৈষ্ণোদেবী বা কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের মতো যে সব ধর্মীয় স্থানে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়-সেগুলোও কোনটি ১৬ মার্চ, কোনটি ১৮ বা ২০ শে মার্চ পর্যন্ত খোলা ছিল-সেটাও তিনি মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

ফলে তাবলিগ জামাতের দিক থেকে গাফিলতি হয়ে থাকলেও সেটা অনেস্ট মিস্টেক বা অনিচ্ছাকৃত একটি ভুল বলেই ফায়জান মুস্তাফার অভিমত-যে ঘটনায় দিল্লি সরকার বা ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাদের দায় এড়াতে পারে না।

 

আরও