ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাংলাদেশের অহঙ্কার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া এই উপমহাদেশের মধ্যে সংস্কৃতির চারণভূমি হিসাবে পরিচিত। ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে এক সময় বলা হতো সংস্কৃতির রাজধানী। অনেক দেশপ্রেমিক বিল্পবীর এবং ক্ষণজন্মা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জন্মভূমি এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

ভারতবর্ষের অনেক খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক, বরেণ্য রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, উচ্চ পদস্হ সরকারী আমলা জন্ম নিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে। যারা অন্ধকারে আলোর দিশারি হয়ে এই উপমহাদেশকে আলোকিত করে গেছেন।

অনেকেই হয়তো জানা নেই ভারতবর্ষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধজয়ী মসনদ-ই-আলা ইশা খাঁর জন্মভূমি। ব্রাহ্মণড়িয়ার সরাইলে তিনি ১৫৩৬ খ্রি; এপ্রিল মাসে (মতান্তরে ১৫৩৭ খ্রি;) জন্মগ্রহণ করেন। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে পুরো ভারতবর্ষে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন এমনকি যারা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের অনেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান।

১৯০৮ সালে ৩ মে মোজাফফরপুরে নাইট ক্লাব থেকে ফেরার পথে অত্যাচারী বৃটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী যে বোমা নিক্ষেপ করেছিলেন সেই বোমা তৈরি করেছিলেন সরাইলের কালিকচ্ছ গ্রামের সূর্য সন্তান ইন্ঞ্জিনিয়ার বিল্পবী উল্লাসকর দত্ত। ভারতবর্ষে কালরত্ন খ্যাত, কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি, নবাব স্যার শামসুল হুদা কে সি আই ই (নাসিরনগর)।

উল্লেখ্য, ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ এক সময় স্যার শামসুল হুদার আর্টিকল ক্লার্ক ছিলেন। ভারতবর্ষের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, সমাজ সংস্কারক, কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেত ব্যারিস্টার এ রসুল, বরেণ্য রাজনীতিবিদ, ব্রটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনবার কারাভোগকারী, ইন্ডিয়ান কংগ্রসের প্রভাবশালী নেতা, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে প্রথম প্রস্তাব উত্থাপনকারী, একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদ ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত (ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা), ভারতবর্ষের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী, বিখ্যাত হোমিওপ্যাথিক কোম্পানি (এম ভট্টাচার্য অ্যান্ড কোং) এবং এ্যালোপ্যাথিক কোম্পানি বেঙ্গল কেমিক্যাল এর প্রতিষ্ঠাতা, দানবীর মহশ চন্দ্র ভট্টাচার্য এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই গর্বিত সন্তান।

এছাড়াও এই উপমহাদেশের সুরের জগতে কিংবদন্তি সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ, গদ্যে প্রথম ইতিহাস লেখক ঐতিহাসিক কৈলাস সিংহ, বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম, এর লেখক অদ্বৈত বর্মণ, কবি লেখক, আইনজীবী ব্রাহ্মসাধক রামকনাই দত্ত, ছান্দসিক কবি আব্দুল কাদির, বাংলা সাহিত্যের শক্তিমান কবি মাহফুজ উল্লাহর জন্ম এই ব্রাহ্মণবাড়িয়ারই সন্তান।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যের অন্যতম উপাদান পুতুল নাচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান বিপিন পালের হাত ধরেই ভারতবর্ষে এর সূচনা হয়েছিল। মোঘল আমলে মোরগ লড়াইয়ের সূচনা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থেকেই হয়েছিল বলে জানা যায়। যা আজো বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় খেলা।

দেশের প্রখ্যাত সাধক হযরত সৈয়দ আহমেদ গেছুদরাজ কল্লা শহীদ (রাঃ), হযরত কাজী মাহমুদ শাহ (রাঃ), হযরত সৈয়দ শাহ শের আলী (রাঃ), হযরত মাওলানা আসগর আহমেদ (রাঃ), হযরত ফখরে বাঙাল তাজুল ইসলামসহ অনেক ইসলামী মহান ব্যক্তিত্বের পূণ্যভূমি এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

মহান মুক্তিযুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অবদান অনস্বীকার্য। ভারতের বিস্তীর্ণ সীমানা ঘেঁষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। ২ এবং ৩ নাম্বার সেক্টর জুড়ে ছিল ব্রাহ্মণবাড়য়া জেলা। আখাউড়া এবং আশুগঞ্জে যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল তা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বঙ্গবন্ধুর সন্তান লেফটেন্যান্ট শেখ রাসেল একাত্তরে আশুগঞ্জ হয়ে উজানিসার ব্রিজের নিচ দিয়ে আগরতলা গিয়েছিলেন (আমার লেখা মুক্তিযুদ্ধ এবং আশুগঞ্জ, ও শেকড়ের সন্ধানে,গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও গেরিলা উপদেষ্টা মরহুম অ্যাডভোকেট লুৎফুল হাই সাচ্চু, সাবেক সেনাপ্রধান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সাব-সেক্টর কমান্ডার জেনারেল নাসিমসহ এই জেলার অনেক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। ঢাকসুর সাবেক জিএস, চার খলিফার একজন, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাতীয় বীর আব্দুল কুদ্দুস মাখন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার গর্বিত সন্তান।

সরকারির বেসরকারি উচ্চ পদস্থ এমন অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিত্ব জন্ম দিয়েছে এই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জন্ম দিয়েছে যারা শুধু বাংলাদেশেই নয় জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। দেশের মুখ উজ্জ্বল করছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস দিয়ে সারা বাংলাদেশের মিল ফ্যাক্টরি চলে, আশুগঞ্জের বিদ্যুৎ দিয়ে সারাদেশ আলোকিত হয়, আশুগঞ্জের সার কারখানার উৎপাদিত সার দিয়ে সারা দেশের কৃষি সচল থাকে, বিপুল পরিমাণে রেমিটেন্সসহ জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ যোগান দেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

 

আরও