অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী ও সিলেট সিটির উন্নয়ন

একুশে পদকপ্রাপ্ত পাওয়া বরণ্যে শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী, গবেষক, বিজ্ঞানী, তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী আর নেই। সমৃদ্ধ ও সফল জীবনের অধিকারী দেশের অগ্রগণ্য এই প্রকৌশলী ১৯৪৩ সালের ১৫ নভেম্বর সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যক্তিজীবনে সদালাপী, কর্মবীর এই জাতীয় ব্যক্তিত্বকে হারিয়ে সারাদেশের মত আমরাও গভীরভাবে শোকাহত। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর একজন বিজ্ঞ প্রকৌশলী; শুধু প্রকৌশলী না, বাংলাদেশের স্ট্রাকচারাল ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার, বাংলাদেশের খ্যাতনামা প্রকৌশলী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান উপদেষ্টা। আমরা তাকে হারিয়ে অত্যন্ত শোকাহত। আমরা তাকে হারিয়ে শোক প্রকাশ করছি। একইভাবে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

তার এই চিরপ্রস্থানের সময়ে বলছি পরিস্থিতি ভালো হলে সিলেট সিটি করপোরেশনের নগর ভবনে আমরা নাগরিক শোকসভা করবো এবং সিটি করপোরেশনে তার যে অবদান তা আমরা কোনোদিনই ভুলবো না। তার দিয়ে যাওয়া পরামর্শ নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। পবিত্র মাহে রমজানের দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আল্লাহ তাআলা যেন তাকে জান্নাতবাসী করেন। আমরা যেন এ শোককে শক্তিতে পরিণত করতে পারি।

তার কাছে আমি যে পরামর্শ পেয়েছিলাম, তিনি আমাদের যে নির্দেশনা দিয়েছিলেন- আমাদের সিলেটের ছড়াগুলো, আমাদের রাস্তা ইনফ্র্যাস্ট্রাকচার, বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন ও আমাদের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তার কাছ ত্থেকে পরামর্শ নিয়েছি। আমাদের বিভিন্ন ধরণের ইকুইপমেন্টস ছিল না। তার পরামর্শতেই ইকুইপমেন্টসসহ বিভিন্ন কলাকৌশল সম্পর্কে আমরা সঠিক দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম।

দুর্ভাগ্য আমাদের, যদি করোনাভাইরাস পরিস্থিতি না আসতো তাহলে সিলেটে আমরা এতদিনে দুই-তিনটা ল্যাবরেটরি করতে পারতাম। তার সহযোগিতা নিয়ে সিলেটের সুরমা নদীর উভয় তীরে আমরা যে মহাপরিকল্পনা নিতে যাচ্ছিলাম এবং সুরমা নদী খননসহ ড্রেজিং কীভাবে করতে হয় এবং নগরকে বর্ধিত করে নগরকে নাগরিক সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক মানের গড়ে তোলার যে স্বপ্ন ছিল, সে স্বপ্নের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি একজন প্রকৌশলী হিসেবে কোনোদিনই আমাদের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সম্মানী নেননি। সিলেট নগরে উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনি শত ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি আমাদের সময় দিতেন, সেটা ভুলার মতো নয়। তার মৃত্যুতে পুরো বাংলাদেশের যেমন ক্ষতি হয়েছে, আমরা আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলাম।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি রেখে মেয়রের চেয়ারে বসে কাজ করা যায় না। এখানে নাগরিক সুবিধা দেখতে হয়। এখানে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠতে হয়। সকলের অভিভাবক হয়ে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়। নাগরিক সুবিধার যেন টেকনিক্যাল সাপোর্ট দরকার সেজন্য অধ্যাপক জামিলুর রেজা স্যারের মতো একজন বিচক্ষণ ও খ্যাতনামা প্রকৌশলীর দ্বারস্থ হয়েছিলাম, সেজন্য আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলতে পারি। তিনিও আমাকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন। আমি যখন চেয়েছি তখন তিনি সিলেটে এসেছেন। তার গাইডলাইনের জন্য আজকে যতটুকু কাজ আমাদের শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ বা আনুষঙ্গিক উন্নয়নের কাজ এতে তার অবদান আমরা কোনোদিনও ভুলতে পারব না। তার কাছে যাওয়ার পরে এখানে আমাদের সার্বিক উন্নয়নই মুখ্য ছিল, এখানে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনসময় দেখা হয়নি।

তিনি একজন আদর্শবান শিক্ষক, একজন আদর্শবান মানুষ দেশের জন্য যাদের অনেক অবদান রয়েছে। তার মত ব্যক্তিত্বরা অন্য একটা ধাপে চলে গেছেন। তারা দেশকে নিয়ে, উন্নয়নকে নিয়ে একজন শিক্ষক হিসেবে উনি আমাদের যেভাবে গাইডলাইন দিয়েছেন সত্যিই অভিভূত। এই বয়সে তিনি সিলেটে অনেক সময় না আসতে পারলেও তার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে ডেকে নিয়েও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। উনার সংস্পর্শে গিয়ে বাংলাদেশের আরও অনেক বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে পেরেছি।

গত সোমবার করোনাভাইরাসের হেবা ফিল্টার নিয়ে বসছিলাম। দুইদিন আগেও তার সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন বুয়েটের একজন অধ্যাপকের কথা। এই যে তার মাধ্যমে যোগাযোগটা হওয়া, যেকোনো প্রকৌশলীকে তিনি বললে উনার কথাটা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে তারা স্মরণ করেন। সেটা থেকে আমরা বঞ্চিত হলাম। তার চলে যাওয়ায় সিলেটবাসী তথা বাংলাদেশের বিরাট ক্ষতি হয়ে গেল।

নগরীর উন্নয়নের কাজে উনি যাদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমি অবশ্যই তাদের সবার শরণাপন্ন হবো। নিশ্চয়ই তাদের একটা গাইডলাইন নেব। সিলেট নগরীর উন্নয়নে তিনি আমাদের কয়েকটা ছক এঁকে দিয়ে গেছেন, আমাদেরকে কয়েকটা গাইডলাইন ও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ ফর্মুলা দিয়ে গেছেন যেটা আমাদের কাজে বিরাট সহায়ক হবে।

দুই দিন আগে আমার সঙ্গে ফোনে সিলেটে হেবা ফিল্টার সংযোজন নিয়ে করোনাভাইরাস সম্পর্কে কথা বলি। তখন তিনি বলেছেন, বুয়েটের এক্সপার্ট যারা মেডিসিন ম্যানুফ্যাকচারিং করেন তাদের এক প্রকৌশলীকে আমার সাথে যোগসূত্র করে দিয়েছেন এবং তার সঙ্গে আমার কথাও হয়েছে। যার মাধ্যমে আমরা হেবা ফিল্টার সেটআপ করার বিরাট পরিকল্পনা করছি। তিনি আমাকে বলেছিলেন হেবা ফিল্টারের আইডিয়া আলাদা করে নিতে হবে।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতির আগে তার এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে আমরা বৈঠক করেছিলাম। বাংলাদেশের খ্যাতনামা অনেক প্রকৌশলীদের তিনি নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের লালদিঘীতে যে মার্কেট তৈরি করবো সেটা নিয়ে বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হয়েছিল। এটাই তার সাথে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ।

চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিলেটে তিনি সর্বশেষ আসেন সিলেট সিটি করপোরেশন ও সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমের যৌথ উদ্যোগে সিলেটে ৭ ভাষাসৈনিককে সম্মাননা অনুষ্ঠানে এসে তিনি আমার বাসায় যান। আমার মেয়েকে তিনি আশীর্বাদ দিয়েছিলেন, পরামর্শ দিয়েছিলেন কী করতে হবে একজন প্রকৌশলী হিসেবে। তার যে অভিভাবকসুলভ আচরণ সত্যিই আমি কী বলবো, আমার একজন অভিভাবক হারালাম।

আমি সিলেট সিটি করপোরেশনের এলাকার সর্বস্তরের নাগরিকের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি। তিনি আমাদেরকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা দিয়ে ঋণী করে গেছেন। আমরা জীবন দিয়েও এই ঋণ শোধ করতে পারব না।

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ভাষায় বলতে হয়- ❛চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়❜। অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর দৈহিক মৃত্যু হয়েছে ঠিক, কিন্তু তিনি আমাদের থেকে একেবারেই চলে যাননি, তার কর্ম তাকে আমাদের মাঝে জীবিত রাখবে।

লেখক: মেয়র, সিলেট সিটি করপোরেশন।

 

আরও