পোশাকের পাশাপাশি খুলছে অন্য খাতের কারখানাও

করোনা সতর্কতার মধ্যে সীমিত পরিসরে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য খাতের কারখানাও খুলে দেওয়া হচ্ছে। টেক্সটাইল, এক্সেসরিজ এবং প্লাস্টিকের কিছু কারখানা রয়েছে এই তালিকায়। বিভিন্ন খাত মিলে সারাদেশের প্রায় তিন হাজার কারখানায় উৎপাদন চালু হয়েছে। তবে উৎপাদন ক্ষমতার ৩০ ভাগের বেশি কাজ হচ্ছে না। উৎপাদন বাড়াতে দুই শিফটে কাজ হয়েছে কোনো কোনো কারখানায়। কারখানা এলাকার আশপাশে বসবাস করা শ্রমিকদের নিয়ে সীমিত আকারে কাজ করার শর্ত থাকলেও গতকাল মঙ্গলবার দূরদূরান্ত থেকে আসা শ্রমিকদের একটি অংশ কাজে যোগ দিয়েছে।

তবে গতকাল এক বৈঠকে শিল্পাঞ্চলের বাইরে থেকে শ্রমিক না আনতে কারখানা মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। অন্যদিকে শ্রম মন্ত্রণালয়ে আরেক বৈঠকে উদ্যোক্তারা শ্রমিক ছাঁটাই না করার অঙ্গীকার করেছেন। আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মঙ্গলবার থেকে আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত আশুলিয়া, সাভার, ধামরাই ও মানিকগঞ্জের কারখানা খুলে দেওয়ার কথা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এলাকার এবং নারায়ণগঞ্জে গত রোববার থেকে সীমিত পরিসরে কারখানা চালু হয়। শিল্পাঞ্চল পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার নতুন করে আরও এক হাজার ৯৬টি কারখানা খুলেছে। সব মিলিয়ে দেশের শিল্পাঞ্চলে গতকাল পর্যন্ত খুলে দেওয়া কারখানার সংখ্যা দুই হাজার ৯১৬টি। এর মধ্যে ডিএমপি এলাকার শিল্পকারখানা অন্তর্ভুক্ত নেই। শিল্পাঞ্চল পুলিশের অধীন এলাকা গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনা। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত বিজিএমইএর সদস্য কারখানা খুলেছে ৯৯৩টি, বিকেএমইএর ৩৮৯টি, বস্ত্র খাতের সংগঠন বিটিএমএর সদস্য ১৩২টি এবং বেপজা এলাকার ২০৮টি। এর বাইরে অন্যান্য খাতের আরও এক হাজার ৩৪৬টি কারখানা চালু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি এক হাজার ৫১৮টি কারখানা খুলেছে গাজীপুর জেলায়। চট্টগ্রাম শিল্পাঞ্চলে ৫৪৮টি, সাভার এবং আশুলিয়ায় ৪৬০টি, নারায়ণগঞ্জে ২২৫টি, ময়মনসিংহে ৭৯টি ও খুলনায় চালু হয়েছে ৮৬টি কারখানা।

বিকেএমইএর প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, যেসব কারখানায় আগের রপ্তানি আদেশের কাজ ছিল, সেসব কারখানাই খুলেছে গত তিন দিনে। চেষ্টা করা হচ্ছে, সব ধরনের নিরাপত্তা পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করার। তার মতে, হাতের কাজ শেষ হয়ে গেলে অনেক কারখানা দীর্ঘ মেয়াদে চালু রাখা সম্ভব হবে না। শারমিনের গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেন জানান, কোনো রকম ত্রুটি এবং সমস্যা ছাড়াই গতকাল পুরোদমে কাজ করেছেন তার বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, গতকাল স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়েছে তা তদারক করেছে তাদের মনিটরিং টিম। ২৭টি কারখানা পরিদর্শনে মাত্র একটি কারখানায় কিছু অবহেলা দেখা গেছে। তৈরি পোশাকের এক্সেসরিজ খাতের বেশ কিছু কারখানা গতকাল খুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজেপিএমইএর সভাপতি আব্দুল কাদের খান। তিনি বলেন, তাদের কারখানা চালু না হলে তৈরি পোশাক উৎপাদন সম্ভব হবে না।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠক : সীমিত আকারে কারখানা খোলা রাখার প্রক্রিয়ার মধ্যে সারাদেশ থেকে শ্রমিক না আনার জন্য মালিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল সকালে মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক, বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান, বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকনসহ ব্যবসায়ী নেতা, শ্রমিক নেতা, ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধসহ সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন উদ্যোক্তারা।

শ্রমিক ছাঁটাই না করার বিষয়ে ঐকমত্য : করোনা পরিস্থিতির মধ্যে শ্রমিক ছাটাই কিংবা কারখানা লে-অফ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন উদ্যোক্তারা। গতকাল বিকেলে শ্রম মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকার, মালিক, শ্রমিকদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে এই প্রতিশ্রুতি দেন তারা। শ্রম প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতা সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন এমপি, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি এ. কে. আজাদ, বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক, সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী এমপি, বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ, শ্রমিক নেতা ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম রাজেকুজ্জামান রতন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের বিষয়ে সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন সমকালকে বলেন, সরকার মালিক ও শ্রমিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সবাই একমত হয়েছে, এপ্রিল পর্যন্ত কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না। এ ছাড়া যেসব কারখানা লে-অফ ঘোষণা করেছে, সেখানকার শ্রমিকরা যেন নায্য পাওনা পান, তা নিয়ে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে আজ বুধবার আবার বৈঠকে বসবেন তারা।

কাঁচামাল রাখতে ড্যামারেজ চার্জ নেবে না বিমান : তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আরও একটি সুবিধা দিয়েছে সরকার। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওয়্যারহাউসে তৈরি পোশাক শিল্পের আমদানি করা কাঁচামাল রাখার জন্য কোনো বাড়তি চার্জ নেওয়া হবে না। ২৬ মার্চ থেকে শুরু করে যতদিন লকডাউন চলবে, ততদিন এ সুবিধা পাবেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।

গতকাল মঙ্গলবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এক চিঠিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মোশাররফ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গত ২৬ মার্চ থেকে ৫ মে পর্যন্ত সরকারি সিদ্ধান্ত মতে লকডাউন চলমান। এ কারণে অনেক পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ জন্য ২৬ মার্চ থেকে লকডাউন চলার সময় পর্যন্ত আমদানি করা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ওয়্যারহাউসে রাখা পোশাক শিল্পের কাঁচামালের ফ্রিটাইম পরবর্তী ডেমারেজ চার্জ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

 

আরও