এলাকাবাসীর চোখে ইরফান সেলিম

পুরান ঢাকার প্রভাবশালী রাজনীতিক-ব্যবসায়ী হাজী মো. সেলিমের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র-মদ উদ্ধারের পাশাপাশি ছেলে ইরফান সেলিমকে কারাদণ্ড দিয়েছে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

নৌবাহিনীর এক কর্মকর্তাকে মারধরের পরদিনই তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘ দিন ‘পেশী শক্তির প্রদর্শন করে’ প্রভাব ধরে রাখা অর্থশালী হাজী সেলিমের ছেলের এই পরিণতি অনেকের কাছে বিস্ময় হয়েও এসেছে।

যে ঘটনায় ইরফানকে এই পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে, সে ধরনের ঘটনা এর আগেও তিনি ঘটিয়েছেন বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ করতে না চাওয়া এই ব্যক্তিদের ভাষ্যমতে, বিদেশে লেখাপড়া করে আসা ইরফান আচরণে তেমন অসংযত না হলেও সামনে-পেছনে মোটর সাইকেলের বহর নিয়ে চলতেন। পুরান ঢাকার সরু গলিতে তার এই যাত্রাপথে বিঘ্ন ঘটালে তার সঙ্গীদের হাতে নিম্ন আয়ের মানুষদের চড়-থাপ্পড়ের বিষয়ে অনেকটা ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছিল তাদের কাছে।

“এই যে ধানমণ্ডির ঘটনা- এটাতো হুট করে একদিনে ঘটেনি। এলাকায় এমন দুই-একজনকে মারধর করেছে বিধায় তো এটা হয়েছে,” বলেছেন তার পরিচিত চকবাজার এলাকার একজন বাসিন্দা।

বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মদিনা গ্রুপের পরিচালকদের একজন ইরফান হাজী সেলিমের মেজ ছেলে।

বাবার প্রভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও হয়েছেন তিনি। বিয়ে করেছেন নোয়াখালীর সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীর মেয়েকে।

মদিনা গ্রুপের একজন কর্মকর্তা জানান, কানাডায় ব্যবসা প্রশাসনে লেখাপড়া করে সাত বছর আগে দেশে ফেরেন ইরফান সেলিম।

তবে গত ফেব্রুয়ারির সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই বাইরে তার আনাগোনা ধরা পড়ে এলাকার মানুষদের চোখে।

“বিদেশে পড়াশোনা করে দেশে আসার পরও এলাকায় ইরফানকে তেমন দেখা যেত না। কাউন্সিলর নির্বাচনের সময় প্রচারণায় ও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর এলাকায় তাকে দেখা যেত,” বলেন স্থানীয় একজন ব্যবসায়ী।

চকবাজারের আরেক ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে বলেন, “বাড়িতেই থাকতেন ইরফান এবং মাঝে মধ্যে আশিক টাওয়ারের ছাদে এসে আতশবাজি ফোটাতেন। কোরবানি ঈদের আগের দিন রাস্তায় গরু নিয়ে আনন্দ করতে দেখা যেত তাকে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী বলেন, এক কোরবানির ঈদের আগের দিন বিকাল ৪টায় আশিক টাওয়ারের সামনে বড় তিনটা গরু রেখে ছাদে উঠে আতশবাজি ফোটাচ্ছিলেন ইরফান সেলিম। মার্কেটের সামনে তিনটি গরু রাখায় মানুষের চলাচলে ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাঘাত ঘটছে সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না তার।

“ইরফান একটু এমনই বেখেয়ালি এবং কমিশনার হওয়ার পর আগে-পিছে অনেক মোটর সাইকেল নিয়ে চলাচল করত।”

চকবাজার মার্কেটের এক ব্যবসায়ী তার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, প্রায় দেড় মাস আগে ইরফানের সঙ্গীরা চকবাজার শাহী মসজিদের সামনের রাস্তায় একবার রাত ১২টার দিকে একজন দুধ বিক্রেতা, একজন ডিম বিক্রতা ও একজন ফল বিক্রেতাকে মারধর করেন।

কেন মারধর করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্ভবত তার গাড়ি চলতে গিয়ে একটু ব্যাঘাত ঘটেছিল। ইরফান মারেনি, তবে তাকে ‘মাতাল’ মনে হয়েছিল।

গত রোববার রাতে ধানমণ্ডিতে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের বিষয়ে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে চকবাজারের এই ব্যবসায়ী বলেন, “এলাকায় এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটত।”

এসবের জন্য ইরফানের সঙ্গীদের দায়ী করেছেন ওই এলাকার মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ছেলেটা (ইরফান) ভালো আছে। বিদেশ থেকে পড়াশোনা করেছে। ঠিকমতো বাংলা বলতে পারে না। সব সময় ঘরে থাকত। কিন্তু তার সাঙ্গপাঙ্গরা তাকে খারাপ করেছে।”

সাঙ্গপাঙ্গ কারা- জানতে চাইলে তিনি সোয়ারি ঘাট এলাকার সেলিম বাবুর নাম উল্লেখ করে বলেন, “ইরফানকে যদি বোঝাত, রাস্তাঘাটে এভাবে চললে মানুষ খারাপ বলবে এবং এটা করলে তার জনপ্রিয়তা কমবে, তাহলে সে করত না।”

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্যের জন্য সেলিম বাবুর সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

মিটফোর্ডের একজন ব্যবসায়ী বলেন, “ইরফান অন্যান্য কাউন্সিলের চেয়ে ভালো মন-মানসিকতার। বয়স কম হওয়াতে চলাফেরাটা ঠিক নয়। কিন্তু আর অন্য কোনোভাবে ব্যবসায়ীদের ডিস্টার্ব করেন না।”

কয়েকটি নাম বলে তিনি বলেন, “তাদের কারণেই আজকে তার এই পরিণতি।”

ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা বলেন, “আগে হাজী সেলিমের সঙ্গে যারা থাকত, তারাই ইরফান সেলিমের আশপাশে থাকত।”

সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সোয়ারি ঘাটের দেবদাস লেনে হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।সোমবার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে সোয়ারি ঘাটের দেবদাস লেনে হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম।

নৌবাহিনীর কর্মকর্তাকে মারধরের ঘটনার পরদিন ইরফানের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অবৈধ পিস্তল, মদ, ইয়াবা, এয়ারগান, ওয়াকিটকি, হাতকড়া পাওয়ার কথা জানায় র‌্যাব। মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করায় ইরফানকে দেড় বছর কারাদণ্ডও দেয় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এছাড়া হাজী সেলিমের মালিকানাধীন চকবাজারের আশিক টাওয়ারের ছাদের একটি কক্ষ থেকে হকিস্টিক, ছোরা, হাতকড়া, রশি, বৈদ্যুতিক তারসহ কিছু সরঞ্জাম উদ্ধার করে র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেন, এখানে ‘নির্যাতন কেন্দ্র’ বানিয়েছিলেন ইরফান।

তবে র‌্যাবের এই বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না স্থানীয়দের কাছে।

আশিক টাওয়ারের পাশের মার্কেটের একজন ব্যবসায়ী এ প্রতিবেদককে বলেন, “ওই ছাদে উঠে মাঝে মধ্যে আতশবাজি ফোটাতে দেখা যেত ইরফানকে। তার চলাফেরায় ছেলেমানুষি আছে। মদ খেতে পারে। হই হুল্লোড় করে রাস্তাঘাটে চলাফেরা করে।

“কিন্তু এভাবে কাউকে নিয়ে মারধর করে থাকলে আমরা কিছুটা হলেও শুনতাম।”

ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে এর আগে থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি বলে জানান চকবাজার থানার ওসি মওদুত হাওলাদার।

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, “রাস্তাঘাটে ইরফান সেলিম কাউকে মারধর করেছে এমন অভিযোগে থানায় কেউ আসেননি। এমন কি তার সঙ্গীরা করেছে, এমন অভিযোগও কেউ এখনও করেনি।”

রাস্তাঘাটে চড়-থাপ্পড় মারার বিষয়ে সাধারণ মানুষ থানায় যেত না কেন- প্রশ্ন করা হলে নবাব নামে স্থানীয় একজন ইরফানের বাবার অর্থ আর রাজনৈতিক প্রভাবের কথাই বলেন।

“পথে-ঘাটে যাদেরকে চড়থাপ্পড় মারা হয়, তারা তো অনেক নিরীহ আর তাছাড়া হাজী সেলিমকে কে না চেনে?”

ইরফান কাউন্সিলর হিসেবে কেমন কাজ করেছেন- জানতে চাইলে মারুফ নামে ছোট কাটারার একজন বাসিন্দা জানান, ‘চম্পাতলী ইউনাইটেড’ নামে ইরফান সেলিমের একটা সংগঠন রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে ওই সংগঠন থেকে লোকজনকে সহযোগিতা করা হয়েছে এবং এখনও প্রতি শুক্রবার সংগঠনের ব্যানারে গরিব মানুষদের খাবার দেওয়া হয়।

লকডাউনের সময় লোকজনকে ঘরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করার কাজে তাকে দেখা গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, চম্পাতলী, দেবীদাস ঘাট লেন, চক মোগলটুলী, সোয়ারিঘাট, ইমামগঞ্জ ও মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকা ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। মশা নিধনের কার্যক্রমেও ইরফান সেলিমকে দেখা গেছে।

মিটফোর্ডের লাল কোয়ার্টারের বাসিন্দা প্রদীপ এ প্রতিবেদককে বলেন, “পূজা ছাড়াও আমাদের কোয়ার্টারে এসে ইরফান সেলিম সহযোগিতা করেন।”

তবে বয়সে তরুণ ইরফান তার সমবয়সীদের নিয়ে যেভাবে কাজ করছিলেন, তা অনেক আওয়ামী লীগ নেতার পছন্দ হচ্ছিল না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, “আমাদের এলাকায় সহযোগিতা করতে আসতেন তিনি একা। আমরা যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী রয়েছি, আমাদেরকে কিছু জানাত না। বিষয়টি হাজী সেলিমকে জানালে ইরফান সেলিম আমার প্রতি খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।”

২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে হাজী সেলিম যেভাবে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নৌকার প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন, এবার সিটি নির্বাচনে ইরফানও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওই নেতা বলেন, “ইরফান সেলিম রাজনীতি করা লোক নয়, বিদেশে পড়াশোনা করেছে। কাউন্সিলর হয়েছেন বাবার পরিচয়ে।

“সুতরাং যারা সঙ্গে থাকবে তারাতো বোঝাবে রাস্তাঘাটে কীভাবে চলতে হয়, কোন এলাকায় গিয়ে সহযোগিতা করলে কাকে কাকে ডাকতে হয়। ভালো সঙ্গী না থাকলে এভাবে বিপদে পড়তে হয়।”

 

আরও