কাঞ্চন কন্যা: ঘরে বসে ব্যবসা করে সফল হচ্ছেন যারা

প্রযুক্তির কল্যাণে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ, এগিয়ে যাচ্ছেন নারী। করোনার এই দুঃসময়ে ঘরে বসেই ব্যবসা করছেন সিলেট অঞ্চলের বহু নারী। যাদের সফলতার গল্প দিনকে দিন আরও সুগম হচ্ছে। এরকম কয়েকজন সফল নারীকে নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পঞ্চম পর্ব আজ।

একসময় নিজেদের প্রয়োজনে মণিপুরিরা তাঁতের কাপড় বুনলেও ধীরে ধীরে এটি বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মণিপুরি শাড়ির বাজার বেড়েছে। কারণ, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে মণিপুরি শাড়ি এখন যে কোনো সম্প্রদায়ের ফ্যাশন সচেতন নারীর কাছে পছন্দের। এই শাড়ি এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।

মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিপ্লোমা করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন ইসমত জাহান হলি। ২০২০ সালের প্রথমদিকে চাকরি ছেড়ে মা-বাবাকে সময় দিতে থাকেন। মৌলভীবাজারের রাজনগরের টেংরানগর গ্রামের বাড়িতে বসে সময় কাটছিল না। করোনার সময় অনলাইনে ব্যবসার চিন্তা মাথায় আসে। তখন মণিপুরি শাড়ির তাঁতীদের দিন ভালো যাচ্ছিল না। তাদের তৈরি কাপড়গুলো জমে যাচ্ছিল। ইসমত জাহান তখন অনলাইনে জমিয়ে তুলেন ব্যবসা, কারিগরদের জন্য এনে দেন সুদিন।

এই যে শুরু করেছিলেন, এখন তিনি গ্রামে বসেই মাসে লাখ-দেড়লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করছেন অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে হলির মা মারা গেছেন। এখন তিনি বাবার একমাত্র সহযোগী এবং অর্থনৈতিক যোগানদাতা।

উই-এর মৌলভীবাজার জেলা মডারেটর ইসমত জাহান মণিপুরি শাড়ি, ওড়না, চাদর নিয়ে কাজ করছেন। হলিস কালেকশন/রকমারি পণ্য নামে অনলাইন পেজের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন।

তিনি বলেন, ‘মণিপুরি মার্কেট এখন প্রচুর ডিমান্ডিং। লকডাউনের সময় মণিপুরি কারিগররা সংকটে ছিল। আমরা গুটি কয়েকজন লেখালেখি করেছি। যারা তৈরি করে তারা দরিদ্র পরিবারের তাঁতি। তাদের বিভিন্ন কিস্তি থাকে। চরম বিপাকে ছিল। যা বানাচ্ছিল তা জমে যাচ্ছিল।’

তাদের দেখাদেখি এখন প্রচুর লোক এগিয়ে এসেছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। জেলায় তালিকাভুক্ত ৫০ এর বেশি উদ্যোক্তা রয়েছে যাদের ৬০ শতাংশ নারীই গ্রাম থেকে ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানান তিনি।

উই-গ্রুপের মাধ্যমে তৈরি হয়েছেন বহু উদ্যোক্তা। এদের আরেকজন রোজিনা আক্তার; যিনি সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চা নিয়ে অনলাইনে ব্যবসা করছেন। সিলেট সদর উপজেলার বিমানবন্দর বড়শালা গ্রামের মেয়ে রোজিনা। সিলেট এমসি কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তবে তিনি এখন পুরোদমে একজন নারী উদ্যোক্তা।

চা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন তিনি। বলেন, ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল। একটি বেসরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু, কিছুদিন পরেই বদলির আদেশ আসে। সেটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এরপরই বিকল্প উপায় খুঁজে বের করতে গিয়ে ‘উই’ নামে একটি ফেইসবুক গ্রুপে যুক্ত হই।’

২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে ‘ঝিয়ারী’ নামে একটি ফেইসবুক পেজ খুলে চায়ের ব্যবসা শুরু করেন রোজিনা। প্রথমদিকে কিছুটা হতাশা কাজ করেছে। তবে, ইউ-এর সিনিয়র উদ্যোক্তাদের দিকনির্দেশনায় সেসব মোকাবেলা করেছেন তিনি।

রোজিনা এখন পর্যন্ত সাড়ে ৭ লাখ টাকার চা বিক্রি করেছেন। ব্লাক টি এর ক্লোন টি, গোল্ড টি, বিটি-২, গ্রীণ টিসহ বিভিন্ন রকম চা নিয়ে তিনি কাজ করছেন। সিলেট ও শ্রীমঙ্গল থেকে এসব চা সংগ্রহ করেন এবং অনলাইন অর্ডার পেয়ে কুরিয়ারে তা সরবরাহ করেন। আর তাতেই সবচেয়ে বড় ঝামেলা নিতে হয়। এই ব্যবসায় ধৈর্য্য ও সাধনা সাফল্যের সবচেয়ে বড় শক্তি বলে মনে করেন তিনি।

‘সিলেটে যুগ যুগ ধরে ফরাস উৎপাদন হলেও এর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানেন না অনেকে। অনেকে মনে করেন এটি কেবল ভারতেই উৎপাদন হয়,’- বলছিলেন অনলাইনে ফরাস শিম নিয়ে কাজ করা নারী উদ্যোক্তা ফিরোজা বেগম। পেশায় একজন শিক্ষক। থাকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর এলাকায়।

করোনা পরিস্থিতিতে স্বামী চাকরি হারানোর পর ফিরোজা পরিবারের মাথায় হাত। অনলাইন ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়েও এগুতে সাহস পাচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে একটি অনলাইন প্লাটফর্ম ‘উই’ থেকে দেশীয় পণ্যের বাজারজাতকরণের আহ্বান পেয়ে নিজেই বেছে নিলেন এই বিশেষ সবজি-ফলের ব্যবসা। ব্যতিক্রম পছন্দ আর নিরলস পরিশ্রমে ঘরে বসেই সাড়া পেলেন এই নারী। সঙ্গে স্বামীর সহযোগিতাও ছিল।

মৌসুমী পণ্য হওয়ায় ফরাসের পাশাপাশি এখন মনিপুরী শাড়ী নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ফিরোজা জানান, সময়টা খারাপ ছিল। শুরুটা কঠিন হলেও এখন তারা ভালোই আছেন। এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন তারা। তাদের পেজের নাম সিলেটীয়ানা।

ত্রিনয়ণীর উদ্যোক্তা স্বর্ণা দাস। কাজ করেন মাটির তৈরি জিনিস নিয়ে। তিনি বলেন, ‘নিজস্ব প্রোডাক্ট সোর্সিং না থাকায় বিপাকে পড়ে যাই। এখন নিজস্ব কারিগরের মাধ্যমে কাস্টমারের পছন্দের ডিজাইনে পণ্য তৈরি করে বিক্রি করছি। মাটির জিনিস হওয়ায় ডেলিভারি করা চ্যালেঞ্জ ছিল।’

শ্রীমঙ্গলের মেয়ে ফারহানা আহমেদ সুহার উদ্যোগের নাম লংলা টি। তিনি কাজ করেন শ্রীমঙ্গলের বিশুদ্ধ চা-পাতা নিয়ে। সিলেটের মেয়ে জিবা বেগমের উদ্যোগের নাম সুরমা কুটির। বিক্রি করেন শিমের বিচি নিয়ে। সিদরাত ফারজানা আঁখির উদ্যোগের নাম উমাইমাহ্। তিনি কাজ করেন মহিলাদের শাড়ি, ওড়না ও জুম শাড়ি নিয়ে। সুনামগঞ্জের উদ্যোক্তা বৃষ্টি রাজ ঋতু। তার উদ্যোগের নাম পরিধি। বিক্রি করেন মায়ের তৈরি দুধের সন্দেশ ও নারকেলে নাড়ু নিয়ে।

এভাবে ঘরে বসেই নিজেদের মেধা আর সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় দিচ্ছেন সিলেটের নারীরা; যা পুরুষের চেয়ে কোনোভাবেই কম নয়। একটু সুযোগ আর সহযোগিতা পেলেই আগামীর চ্যালেঞ্জ নিতে আজ প্রস্তুত তারা।

আরও