বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকবে আরও দুই সপ্তাহ

দেশে এবার ডেল্টা ও ওমিক্রনের সমন্বিত সংক্রমণে সয়লাব। ভাইরাসটি রোধে সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে।

কিন্তু মাঠপর্যায়ে তা যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় কোনো প্রস্তুতিই কাজে আসছে না। এতে সার্বিকভাবে করোনা নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

তাদের মতে, আরও দু-এক সপ্তাহ সংক্রমণ বাড়তে পারে। এরপর এক সপ্তাহ সমান্তরাল থাকবে। তারপরে নিম্নমাগী হবে। সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে, না হলে বিপদ বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, সংক্রমণ আরও কিছুদিন বাড়তে পারে। কমপেক্ষ আরও দু-এক সপ্তাহ সংক্রমণ ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। এরপর এক সপ্তাহ সমান্তরাল থাকবে। তারপরে নিম্নগামী হবে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ এবং সাধারণ মানুষ কি করবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, মানুষের উচিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। সঠিক নিয়ম মেনে মাস্ক পরা। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারিভাবে হাসপাতাল প্রস্তুত করতে হবে।

টিকা কার্যক্রমে গতি বাড়াতে হবে। হাসপাতাল রোগীদের অক্সিজেন নিশ্চিত করতে হবে। নমুনা পরীক্ষা সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে দৈনিক টেস্টের সংখ্যা অবশ্যই এক লাখ হলে ভালো হতো।

টেস্ট কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে জনবল নিয়োগ দিতে হবে। তিনি বলেন, করোনার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নির্দেশনা তেমন কার্যকর হচ্ছে না। এ মুহূর্তে শুধু টিকা কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

আর হাসপাতাল প্রস্তুতির কথা বলছে। আসলে সংক্রমণ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। যদিও এ স্বাস্থ্যবিধি মানানোর দায়িত্ব সরকারের একার নয়, এর সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা জরুরি। কিন্তু সরকার নির্দেশনা দিলেও প্রশাসনের তৎপর তেমন নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সর্বশেষ বুধবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪৯ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা করে ১৫ হাজার ৫২৭ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এ সময় আরও ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুনসহ দেশে মোট করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৭ লাখ ৩১ হাজার ৫২৪। তাদের মধ্যে ২৮ হাজার ২৭৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

করোনা বিষয়ক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর তথ্য দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ওই বছরের শেষ দিকে সংক্রমণ কিছুটা কমলেও গত বছরের এপ্রিল থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত করোনার ডেল্টা ধরন ব্যাপক আকার ধারণ করে। বছরের শেষ কয়েক মাস পরিস্থিতি কিছুটা শিথিল ছিল। কিন্তু এ বছরের শুরু থেকে ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্টসহ করোনার বিস্তার ফের বাড়তে থাকে। শুরু হয় করোনার তৃতীয় ঢেউ। এখন ঘরে বাইরে সর্বত্র ভাইরাসটি শনাক্ত হচ্ছে। এরপরও হাট-বাজার, মেলা, বাস-ট্রেন কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে ১১ ডিসেম্বর ওমিক্রন প্রথম শনাক্তের ঘোষণা আসে ১১ ডিসেম্বর। ওই মাসেই আইসিডিডিআরবির ল্যাবে পরীক্ষা করা শুধু ঢাকা শহরের ৭৭ জন করোনা রোগীর মধ্যে পাঁচটিতে ওমিক্রন শনাক্ত করা হয়েছিল। অন্যগুলো ছিল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। এরপর থেকে দুই ধরনের আধিপত্য ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সংক্রমণ পরিস্থিতি ফের উদ্বেগ ছড়াচ্ছে।

ওমিক্রন দাপটের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক রোগী বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) একটি গবেষণা পরিচালনা করে। সেখান বলা হয়-খোদ ঢাকা শহরেই করোনার তিনটি সাব টাইপ রয়েছে। গবেষণায় পরীক্ষিত নমুনার মধ্যে ২৮ শতাংশ করোনায় আক্রান্ত। আর আক্রান্তদের মধ্যে ওমিক্রন ছিল ৬৯ শতাংশের দেহে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি করোনা রোগীদের ৮৫ ভাগই টিকা নেননি। এমনকি করোনায় মারা যাওয়াদের বেশিরভাগেরও টিকা নেওয়া ছিল না। ইতোমধ্যে সরকারি হাসপাতালের ২৫ শতাংশ বিছানায় রোগী ভর্তি রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনের সামাজিক সংক্রমণ ঘটেছে। উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ৮০ শতাংশই পজিটিভ। যাদের বেশিরভাগই করোনার নতুন ধরন ওমিক্রনে আক্রান্ত।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, সারা বিশ্বেই ওমিক্রন করোনা শনাক্তের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

বাংলাদেশেও দু-এক দিনের মধ্যে শনাক্তের আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। নমুনা পরীক্ষা বাড়ানো গেলে আক্রান্ত ও শনাক্তের হার আরও বাড়বে। ১০ জনের পরীক্ষা করে একজন পাওয়া যাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসা সুবিধা বাড়াতে হবে। পরীক্ষা করার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

আরও