শহরে আরও বাড়বে সংসদীয় আসন

 পুরো ঢাকা জেলায় এখন ২০টি সংসদীয় আসন। ২০১১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ২০ লাখ। এবারের জনশুমারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ। সাধারণ হিসাব কষলে বর্তমানে প্রতিটি আসনের জনসংখ্যা গড়ে ৭ লাখ ৩৫ হাজার। এর বিপরীতে দক্ষিণের জেলা ঝালকাঠিতে সংসদীয় আসন মাত্র দুটি। নতুন শুমারিতে এই জেলায় লোকসংখ্যা ৬ লাখ ৬১ হাজার। প্রতিটি আসনের বিপরীতে জনসংখ্যা গড়ে ৩ লাখ ৩০ হাজার ৫০০।

এ দুই জেলার জনসংখ্যার হিসাবটাই বলে দিচ্ছে সংসদের ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচন হলেও জনপ্রতিনিধিরা সমান সংখ্যক ভোটারের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পান না। ফলে এটাকে কোনোভাবেই সমতা বলতে নারাজ বিশ্নেষকরা। এসব বিষয়ে ভারসাম্য আনতে বড় ধরনের আসন বিন্যাসের প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা। সংশ্নিষ্টদের মতে, আসনভিত্তিক জনসংখ্যায় বেশি তারতম্য থাকলে সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে জনগণের বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়।

এই পটভূমিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য প্রশাসনিক এলাকার তথ্য দিতে ইতোমধ্যে সব জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ইসির উপসচিব আব্দুল হালিম খানের সই করা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণের জন্য সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল প্রকাশিত নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণের গেজেটের পর যেসব প্রশাসনিক এলাকা সৃজন, বিয়োজন ও সংকোচন করা হয়েছে এর তথ্য প্রয়োজন। এসব তথ্য প্রামাণিক দলিলসহ জরুরি ভিত্তিতে ২০ জুনের মধ্যে পাঠাতে বলা হয়েছিল।’

নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীরের নেতৃত্বে গঠিত সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত কমিটির সিদ্ধান্তের আলোকে ওই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই কমিশন বৈঠকে বসে এ বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করবে। ইসি এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে।

নতুন আইনে কী আছে :জাতীয় সংসদের সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে নতুন আইনে বলা আছে, সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সংখ্যক সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পুরো দেশকে ওই সংখ্যক একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করা হবে। এ ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং জনশুমারির ভিত্তিতে যতদূর সম্ভব বাস্তবভিত্তিক বণ্টনের কথা বলা হয়েছে। তবে ২০০৮ সালের পর কাজী রকিব কমিশন ও কে এম নূরুল হুদা কমিশন সীমানা পুনর্বিন্যাসের বড় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক চাপে পিছু হটে। তৎকালীন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকার সীমানা বদল হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হলে চাপে পড়ে যায় ইসি। ফলে তাঁরা সামান্য কিছু পরিবর্তন এনেই সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া গুটিয়ে নেন। ফলে আসনভিত্তিক জনসংখ্যায় বড় তারতম্য থেকেই যায়।

এ ছাড়া আইনে বলা আছে, ইসির সীমানা নির্ধারণের বিষয় নিয়ে দেশের কোনো আদালত বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন তোলা যাবে না। তবে অতীতে দেখা গেছে, সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা ইসির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করেন। ইসিও মামলা জটিলতা থেকে রেহাই পেতে যতটা সম্ভব কম পরিবর্তনের দিকেই মনোযোগী থাকে।

১৫০ আসনে নেই জনসংখ্যার ভারসাম্য :বিদ্যমান সীমানায় ১৫০টির মতো আসনে ভোটার ভারসাম্য নেই। কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলায় রয়েছে ১১টি করে সংসদীয় আসন। নতুন শুমারিতে কুমিল্লার জনসংখ্যা ৫৩ লাখ ৮৭ হাজার এবং ময়মনসিংহের জনসংখ্যা ৫১ লাখ। ৪০ লাখ জনসংখ্যার টাঙ্গাইলে আছে ৮টি আসন। অন্যদিকে গাজীপুরে ৫২ লাখ ৬৩ হাজার এবং নারায়ণগঞ্জে ৩৯ লাখ জনসংখ্যায় উভয় জেলায় সংসদীয় আসন পাঁচটি করে। একইভাবে চুয়াডাঙ্গায় ১২ লাখের বেশি জনসংখ্যায় আসন রয়েছে দুটি। তবে পিরোজপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুরে একই জনসংখ্যায় প্রতিটি জেলায় তিনটি করে সংসদীয় আসন রয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যমান সীমানায় ৩৫টি আসনে আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা হয়নি। এসব আসনে এক উপজেলার এক বা একাধিক ইউনিয়নকে অন্য উপজেলার সঙ্গে যুক্ত করে একটি সংসদীয় আসন করা হয়েছে। ফলে এসব ইউনিয়নের বাসিন্দারা স্থানীয় সংসদ সদস্যদের নানা অবহেলার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন সংসদীয় আসনের মধ্যে রয়েছে- সিরাজগঞ্জ-১ ও ২, পাবনা-১ ও ২, চুয়াডাঙ্গা-১ ও ২, ঝিনাইদহ-২ ও ৪, যশোর-৩ ও ৪, নড়াইল-১ ও ২, খুলনা-৩ ও ৪, সাতক্ষীরা ৩ ও ৪, মানিকগঞ্জ-২ ও ৩, ঢাকা-২ ও ১৯, গাজীপুর-২ ও ৫, নরসিংদী ১ ও ২, ফরিদপুর-৪, গোপালগঞ্জ-২ ও ৫, মাদারীপুর-২ ও ৩, নোয়াখালী-১ ও ২ এবং চট্টগ্রাম-৭, ১৪ ও ১৫।

আসন বাড়তে পারে নগর-শহরে :এবারের শুমারিতে পাঁচটি করে সংসদীয় আসনের জেলা নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরেও বেড়েছে জনসংখ্যা। ২০১১ সালে গাজীপুরের লোকসংখ্যা ছিল ৩৪ লাখ। নতুন শুমারিতে বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৫২ লাখ। নারায়ণগঞ্জের সাড়ে ২৯ লাখ জনসংখ্যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯ লাখে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ও জনসংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

সংসদীয় আসনের সীমানায় সর্বশেষ বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছিল ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। তখন ১৩৩ আসনের সীমানায় বদল আনা হয়। শুধু ঢাকা জেলাতেই আসন বেড়েছিল সাতটি। এরপর ২০১৩ ও ২০১৮ সালে জেলার আসন সংখ্যা ঠিক রেখে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়। একাদশ সংসদের সীমানা নির্ধারণের আগে অবশ্য আওয়ামী লীগ বিদ্যমান সীমানায় এবং বিএনপি ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল ইসিকে।

ওই সময় সীমানা নির্ধারণের জন্য ইসিকে সামরিক সরকারের ফরমান বলে প্রণীত ‘ডিলিমিটেশন অব কনস্টিটিউয়েন্সিস অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬’ অধ্যাদেশ অনুসরণ করতে হয়েছে। তবে গত সেপ্টেম্বরে জাতীয় সংসদে সামরিক সরকারের ওই অধ্যাদেশের বদলে নতুন বিল পাস হয়। যদিও পাস হওয়া ওই আইনে তেমন নতুন কিছুই সংযোজন করা হয়নি। তৎকালীন ইসির সংশোধনীর সুপারিশগুলোও আমলে নেয়নি জাতীয় সংসদ। তবে আইনে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে ইসিকে। এখন ইসিকে বিধি প্রণয়ন করে সীমানা নির্ধারণের কাজে হাত দিতে হবে।

কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন ২০১৯ সালের ১১ ডিসেম্বর সীমানা নির্ধারণ আইনটিতে কয়েকটি সংশোধনীসহ সরকারের কাছে পাঠিয়েছিল। তাতে প্রস্তাব করা হয়েছিল, জনসংখ্যা কোটার ভিত্তিতে আসন বণ্টনের সঙ্গে ভোটার সংখ্যা ?যুক্ত করার। এ ছাড়া সিটি করপোরেশন, বড় বড় শহরের ও পল্লি এলাকার ভারসাম্য রক্ষার কথাও বলা হয়েছিল ওই প্রস্তাবে।

ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী জানিয়েছেন, জনসংখ্যার সমতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা সমন্বয় করতে গিয়ে প্রতিবারই বিপাকে পড়ে কমিশন। ২০০৮ সালে ১৩৩ আসনের সীমানা পরিবর্তনের কাজে সম্পৃক্ত থাকা ইসির এই সাবেক কর্মকর্তা জানান, ইতোমধ্যে জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়া গেলে সীমানা নির্ধারণের কাজে হাত দেওয়া বর্তমান ইসির জন্য বাধ্যতামূলক হবে।

তিনি বলেন, পুরোনো অধ্যাদেশটি বাংলায় রূপান্তর এবং ইসিকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা ছাড়া নতুন আইনে কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাই আইন নতুন হলেও ইসির জন্য পুরোনো চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। তাঁর মতে, বিধি প্রণয়নের মাধ্যমে শহর এলাকার জন্য সর্বোচ্চ আসন সংখ্যা নির্ধারণ এবং জেলার জন্য সর্বনিম্ন আসন নির্ধারণ করে দিতে হবে। অন্যথায় জনসংখ্যার বিচারে শহর এলাকায় আসন বাড়তেই থাকবে। কমতে থাকবে ছোট জেলার আসন। তিনি বলেন, ঢাকায় একটি আসনে গড়ে সাড়ে ৭ লাখ জনসংখ্যা। অন্যদিকে ঝালকাঠি, নড়াইল ও মেহেরপুরের মতো ছোট জেলার মোট জনসংখ্যাই সাড়ে ৭ লাখ হচ্ছে না। এর বাইরে শিল্পাঞ্চলে বসতি বাড়ছে চরাঞ্চলে বসতি কমছে- এসব বিষয় নিয়ে বিধি প্রণয়ন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সীমানা বিন্যাসের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদ হলো ৫ থেকে ৩০ শতাংশ পার্থক্য। যেমন, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, আলবেনিয়া, ইয়েমেনে গ্রহণযোগ্য পার্থক্য ৫ শতাংশ; অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, ইউক্রেনে ১০ শতাংশ; আর্মেনিয়া, জার্মানি, চেক রিপাবলিকে ১৫ শতাংশ; জিম্বাবুয়ে, পাপুয়া নিউগিনিতে ২০ শতাংশ, কানাডাতে ২৫ শতাংশ; সিঙ্গাপুরে ৩০ শতাংশ।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান বলেন, বিগত নির্বাচনের আগে আমাদের দল সীমানা পরিবর্তনের বিপক্ষে ছিল। কারণ এ নিয়ে ওই সময় নতুন কোনো রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হোক তা আওয়ামী লীগ চয়নি। এবার যেহেতু জনশুমারি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে তাই ইসিকে সীমানা বিন্যাস করতেই হবে। এ ব্যাপারে দলীয় ফোরামে এখনও কোনো আলোচনা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ২০০৮ সালের সীমানা পরিবর্তন ছিল রাজনৈতিক। এ কারণেই বিএনপি এর বিরোধিতা করেছিল। শামসুল হুদা কমিশন আওয়ামী লীগকে বিশেষ সুবিধা দিতে অনেক আসনে অযৌক্তিক বদল এনেছিল। বর্তমান কমিশনের ওপরও আমাদের আস্থা নেই।

এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু জানান, জনসংখ্যায় বড় ধরনের তারতম্য না হলে সীমানায় পরিবর্তন না করার পক্ষে তাঁর দল। সীমানা বিন্যাস ইসির সাংবিধানিক দায়িত্ব- এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর চেয়ে বড় দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা। ইসির উচিত হবে সেদিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া।

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগের ছয় মাসের মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর কিংবা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন হতে পারে। ২০১৮ সালে সর্বশেষ ২৫টি সংসদীয় আসনের সীমানায় পরিবর্তন করা হয়েছিল।

আরও