হরমুজ সংকটে এশিয়ায় জ্বালানি বিপর্যয়, ফিরছে কোভিডকালের কৌশল
প্রকাশিত হয়েছে : ১১:২৯:৫০,অপরাহ্ন ২৫ মার্চ ২০২৬ | সংবাদটি ২ বার পঠিত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ওলটপালট হয়ে গেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো জ্বালানি সংকট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
কারণ, এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেলের ৮০ শতাংশই আমদানি করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা বর্তমানে ইরান প্রায় পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি মোকাবিলায় এশিয়ার দেশগুলো এখন তাদের কোভিড-১৯ মহামারী কালের ডায়েরির পাতা উল্টাতে শুরু করেছে।
ঘরে বসে অফিস (ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম) থেকে শুরু করে প্রণোদনা দেওয়ার মতো পদক্ষেপগুলো আবার ফিরিয়ে আনার চিন্তাভাবনা করছে তারা।
কোনও দেশ এখনও এসব পদক্ষেপ চালু না করলেও, কয়েকটি দেশ বলেছে, তারা এই বিকল্প হাতে রেখেছে।
ঘরে বসে কাজ ও কৃচ্ছ্রসাধন:
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তেলের দামের চাপ কমাতে ঘরে বসে কাজ করা (ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম) এবং বিমান ভ্রমণ এড়িয়ে চলার প্রস্তাব দিয়েছে।
আইইএ নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল বলেন, “ইউক্রেইন যুদ্ধের সময় ইউরোপীয় দেশগুলো এই পদ্ধতি মেনে চলে রাশিয়ার জ্বালানি ছাড়াই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল।”
দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নাগরিকদের গোসলের সময় কমানো, দিনে ফোন চার্জ দেওয়া এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ভ্যাকিউম ক্লিনার চালানোর মতো কৃচ্ছ্র সাধনের অনুরোধ জানিয়েছে।
দেশটির জ্বালানি মন্ত্রী কিম সুং-হোয়ান জানিয়েছেন, তারা সরকারিভাবে ‘ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম’ চালুর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছেন।
একই পথে হাঁটছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাও। পাকিস্তান ইতোমধ্যে দুই সপ্তাহের জন্য স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে এবং অফিসকর্মীদের ঘরে বসে কাজ করতে বলেছে। দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা জ্বালানি সাশ্রয়ে প্রতি বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চারনাভিরাকুল সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর স্থগিত, এসি ২৫ ডিগ্রির ওপরে রাখা এবং লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি পোশাকের ক্ষেত্রেও স্যুট-টাই বর্জন করতে বলা হয়েছে।
ফিলিপিন্স বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে ‘জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। দেশটিতে ডিজেল ও পেট্রোলের দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে দেশটিতে কিছু কিছু সরকারি অফিসে কর্মসপ্তাহ কমিয়ে আনা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ফার্দিন্যান্দ মার্কোস জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বলেছেন, যুদ্ধ দেশের জ্বালানি সরবরাহের জন্য ‘আসন্ন বিপদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় আতঙ্কিত হয়ে তেল মজুত করার ফলে শত শত পেট্রোল পাম্প জ্বালানি শূন্য হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার তেলের দাম নিয়ে কারসাজি করলে দ্বিগুণ জরিমানার আইন পাস করতে যাচ্ছে।
জ্বালানির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় জাপান সরকার ৮০০ বিলিয়ন ইয়েন (৫ বিলিয়ন ডলার) ভর্তুকি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যাতে লিটারপ্রতি তেলের দাম ১৭০ ইয়েনের আশেপাশে রাখা যায়।
নিউজিল্যান্ডও এপ্রিল থেকে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে প্রতি সপ্তাহে ৫০ নিউজিল্যান্ড ডলার করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
কোভিড মহামারীর সময়ের সঙ্গে এই সংকটের একটি বড় পার্থক্য হলো সুদের হার। মহামারির সময় সুদের হার কমানো হলেও এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো উল্টো পথে হাঁটছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অস্ট্রেলিয়া ইতোমধ্যেই এ বছর দুবার সুদের হার বাড়িয়েছে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদ জেনিফার ম্যাককিউন বলেন, “তেলের দাম বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এক ক্লাসিক নীতিগত উভয়সংকটে পড়ে। একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়ে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।”




