ফাইনালে মারামারি: তদন্ত শুরু করল ফিফা
প্রকাশিত হয়েছে : ১১:৩৮:১৩,অপরাহ্ন ২১ জুলাই ২০২৬ | সংবাদটি 0 View
বিশ্বকাপ ফাইনালের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে ঘটে যাওয়া মারামারির ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। তদন্তে দোষী প্রমাণিত হলে আর্জেন্টাইন বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়কে বড় ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
স্থানীয় সময় রোববার (১৯ জুলাই) নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের গোলে আর্জেন্টিনাকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ জেতে স্পেন।
সংবাদমাধ্যম ইয়াহু স্পোর্টসের খবরে বলা হয়, ফাইনাল ম্যাচ শেষে দুই দলের বেশ কয়েকজন খেলোয়াড়ের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। এমনি কোচিং স্টাফের সদস্যদেরও ওই ঘটনায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘটনার একপর্যায়ে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে স্পেনের ডিফেন্ডার এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরতে দেখা যায়। এরপর উভয় দলের খেলোয়াড়রা একে অন্যকে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকেন এবং কয়েকজনকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।
এ বিষয়ে ফিফা এক বিবৃতিতে জানায়, স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফিফা বিশ্বকাপ ফাইনালের ম্যাচ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর এবং ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোডের ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে, ম্যাচ-পরবর্তী ঘটনাগুলোতে শৃঙ্খলাবিধি লঙ্ঘনের সম্ভাব্য অভিযোগ তদন্তের জন্য ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি একজন ডিসিপ্লিনারি অ্যান্ড এথিকস প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেষ বাঁশির পর পারেদেস লাল কার্ড দেখেন এবং তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামার কিছুক্ষণ পর একটি কঠোর ট্যাকলের জন্য তিনি একটি হলুদ কার্ডও দেখেছিলেন।
বিবিসির খবরে বলা হয়, শেষ বাঁশি বাজতেই লিওনেল মেসিসহ আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় হতাশ হয়ে মাঠে বসে পড়েন। কেউ কেউ স্থির দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর স্পেনের খেলোয়াড়রা উল্লাসে মাঠজুড়ে দৌড়াতে শুরু করেন। অতিরিক্ত সময়ে বদলি হয়ে মাঠ ছাড়ার পর বেঞ্চ থেকে সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনে যোগ দিতে ছুটে আসেন স্পেনের রদ্রি। এ সময় তিনি নাহুয়েল মোলিনার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারটি তার বাহু বা পেটে ঘুষি মারেন বলে মনে হয়।
সেখান থেকেই উত্তেজনার সূচনা হয়। এসময় রদ্রি মোলিনার মুখোমুখি হলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান মোলিনা। এরপর সতীর্থকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন এরিক গার্সিয়া। তখনই পারেদেস গার্সিয়ার গলায় আঙুল দিয়ে আঘাত করেন। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন স্পেনের বদলি খেলোয়াড় গাভি। তবে তাকে মাটিতে ফেলে দেন থিয়াগো আলমাদা। পরে পারেদেসও গাভির মুখে হাত দিয়ে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন।
একপর্যায়ে সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালাকে গার্সিয়ার গলা চেপে ধরতে দেখা যায়। এরপর তাকে স্পেনের মিডফিল্ডার দানি ওলমোকেও আঘাত করতে দেখা যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, আর্জেন্টিনার প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনিকে এক পর্যায়ে একজন স্প্যানিশ খেলোয়াড় আটকে রাখেন। তখন তাকে কারও উদ্দেশে চিৎকার করতে দেখা যায়। একই সময়ে আর্জেন্টিনার নিকোলাস ওতামেন্দিও স্পেনের অধিনায়ক রদ্রিসহ কয়েকজন খেলোয়াড়ের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ান। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ ছাড়া আর্জেন্টিনার সহকারী কোচ রবার্তো আয়ালাকে স্পেনের দানি ওলমোর কাছে গিয়ে তার থুতনিতে ঘুষি মারতে দেখা গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে দুজনকে আলাদা করে দেওয়া হয়।
ম্যাচ শেষে স্কালোনি বলেন, জয়ে যেমন উদার হতে হয়, পরাজয়েও তেমন হতে হবে। আমরা হার মেনে নিচ্ছি। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়েছি। এই ম্যাচের আগে আমরা শারীরিকভাবে অনেকটাই ক্লান্ত ছিলাম। কিন্তু আজ যেভাবে সবাই নিজেদের সর্বোচ্চটা দিয়েছে, সেটি আমাদের জনগণ ও দেশের জন্য দারুণ একটি উদাহরণ।
হারের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের আচরণের সমালোচনা করেছেন অনেকেই। তাদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক জো হার্টও।
গোল ডটকমকে তিনি বলেন, আজ মাঠে একজনই সত্যিকারের মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করেছেন, তিনি লিওনেল মেসি। তিনি স্পেনের প্রতিটি খেলোয়াড়ের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে। আজ যা হয়েছে, তা নিয়ে তাদের অভিযোগ করার কোনো সুযোগ নেই। এটি ঘৃণ্য আচরণ।
বিবিসির ধারাভাষ্যে ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘পারেদেস দু-তিনটি ঘুষি ছোড়েন। এ ধরনের আচরণের কোনো জায়গা নেই।’
ফিফার তদন্তে ঠিক কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, সে বিষয়েও প্রতিবেদনে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পারেদেসের গলা চেপে ধরার ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই লাল কার্ডযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। পাশাপাশি নাহুয়েল মোলিনা ও রবার্তো আয়ালার ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আসবে।
কী ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে পারে আর্জেন্টিনা?
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির সামনে একাধিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ডিসিপ্লিনারি অ্যান্ড এথিকস প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়ার অর্থ হলো, শুধু সহিংস আচরণ নয়, সম্ভাব্য অন্যান্য শৃঙ্খলাভঙ্গের বিষয়ও খতিয়ে দেখা হবে। খেলোয়াড় বা জাতীয় ফুটবল সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আরও কঠোর শাস্তির সম্ভাবনা তৈরি হবে।
ফিফার শৃঙ্খলা বিধির ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আপত্তিকর আচরণ এবং ফেয়ার প্লের নীতিমালা নিয়ে বিধান রয়েছে। খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের আচরণকে ‘শোভন আচরণের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন’ কিংবা ‘ফুটবল বা ফিফার সুনাম ক্ষুণ্ন করে এমন আচরণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
তদন্তকারী প্রসিকিউটর অভিযোগ মূল্যায়নের সময় পরিস্থিতির অবনতি বা লঘুকারী—উভয় ধরনের বিষয় বিবেচনায় নেবেন। প্রয়োজনে তিনি বিশ্বব্যাপী কার্যকর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশও করতে পারবেন।
এর আগে ২০২৩ সালে নারী বিশ্বকাপের ফাইনালের পর খেলোয়াড় জেনি এরমোসোকে ঠোঁটে চুম্বন করার ঘটনায় তৎকালীন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লুইস রুবিয়ালেসের বিরুদ্ধেও একই ধরনের বিধান প্রয়োগ করেছিল ফিফা। পরে তাকে তিন বছরের জন্য ফুটবল-সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিলও খারিজ হয়।
২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড় দেওয়ার ঘটনায় উরুগুয়ের স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজকে চার মাসের জন্য সব ধরনের ফুটবল কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এর ফলে লিভারপুলের হয়ে প্রিমিয়ার লিগের প্রথম নয়টি ম্যাচ খেলতে পারেননি তিনি।
তবে আলমাদা, আয়ালা, মোলিনা কিংবা পারেদেসের ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করা হচ্ছে।
অতীতেও শাস্তির মুখে পড়েছে আর্জেন্টিনা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খেলোয়াড়দের আচরণ নিয়ে একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েছে আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।
২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর ‘আপত্তিকর আচরণ ও ফেয়ার প্লের নীতি লঙ্ঘন’ এবং ‘খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের অসদাচরণ’-এর অভিযোগে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের পর গোল্ডেন গ্লাভস ট্রফি নিয়ে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করেছিলেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। পরে ড্রেসিংরুমে ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে বিদ্রূপ করতেও দেখা যায় তাকে।
ওই ঘটনায় আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ১৮ হাজার ৩০০ পাউন্ড জরিমানা করা হলেও কোনো খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে পৃথক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
তবে ২০২৪ সালে চিলি ও কলম্বিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ‘আপত্তিকর আচরণ’-এর দায়ে মার্তিনেজকে দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল।
চিলিকে ৩-০ গোলে হারানোর পর কোপা আমেরিকার রেপ্লিকা ট্রফি নিয়ে আগের সেই অঙ্গভঙ্গি পুনরাবৃত্তি করেন তিনি। চার দিন পর কলম্বিয়ার কাছে ২-১ গোলে হারের পর মাঠে এক ক্যামেরাম্যান কাছে আসলে নিজের গ্লাভস দিয়ে ক্যামেরায় আঘাত করেন।
২০২৪ কোপা আমেরিকা জয়ের পর চেলসির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করলে সেটিকে ‘বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক’ স্লোগান বলে অভিযোগ তোলে ফরাসি ফুটবল ফেডারেশন।
এবারের বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয়ের পর ‘লাস মালভিনাস সন আর্জেন্তিনাস’ (অর্থাৎ ‘ফকল্যান্ড আর্জেন্টিনার’) লেখা ব্যানার প্রদর্শনের ঘটনায় এএফএর বিরুদ্ধে জরিমানার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া ব্যানারটি হাতে থাকা ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, জিওভানি লো সেলসো এবং লিসান্দ্রো মার্তিনেজের বিরুদ্ধেও ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
ইউরো ২০২৪-এর ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর ‘জিব্রাল্টার স্পেনের’ স্লোগান দেওয়ায় স্পেনের আলভারো মোরাতা ও রদ্রিকে এক ম্যাচ করে নিষিদ্ধ করেছিল উয়েফা। ফিফা কবে নাগাদ এ তদন্ত শেষ করবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।
উদাহরণ হিসেবে, ১৮ ফেব্রুয়ারি বেনফিকার জিয়ানলুকা প্রেস্টিয়ান্নির বিরুদ্ধে রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের প্রতি বর্ণবাদী আচরণের অভিযোগ তদন্তে উয়েফা একজন ডিসিপ্লিনারি ও এথিকস ইন্সপেক্টর নিয়োগ করেছিল। তদন্ত শেষে প্রায় দুই মাস পর, ২৪ এপ্রিল প্রেস্টিয়ান্নিকে সমকামীবিদ্বেষী আচরণের দায়ে ছয় ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, যার মধ্যে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দুই বছরের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছিল।




