সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেন নেতানিয়াহু, চাবিকাঠি আরবদের হাতে
প্রকাশিত হয়েছে : ৭:২২:৫৮,অপরাহ্ন ০৪ নভেম্বর ২০২৬ | সংবাদটি ৪ বার পঠিত
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ায় দেশটিতে চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যয়ন করার কথা থাকলেও, সরকার গঠনের জটিল সমীকরণ এখনো মেলেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসনের প্রয়োজন। কিন্তু প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে আরব নেতৃত্বাধীন দুটি রাজনৈতিক জোট জয়েন্ট লিস্ট এবং রা’আম (ইউনাইটেড আরব লিস্ট)। তারা নিজেদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১৯টি আসন লাভ করেছে। কোনো পক্ষেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় এই আরব দলগুলো কিংবা অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোই এখন সরকার গঠনের মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট, ইয়াইর লাপিদ, গাদি আইজেনকট, বামপন্থী নেতা ইয়াইর গোলান এবং ডানপন্থী আভিগদর লিবারম্যানের বিরোধী জোট একটি ‘জাতীয় জরুরি সরকার’ গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে খোদ বিরোধী জোটের ভেতরেই মতপার্থক্য রয়েছে। আরব দলগুলো কিংবা নেতানিয়াহুর জোটের অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোর সমর্থন ছাড়া বিরোধীদের পক্ষেও ৬১ আসনের ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়া সম্ভব নয়।
নির্বাচনে আরব দলগুলোর অভাবনীয় সাফল্যের পর নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ভোট কারচুপি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছিল। তবে পুলিশ তদন্ত করে এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছে। যদিও দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের একটি পৃথক তদন্ত এখনো চলমান।
আরব দলগুলোর সমর্থন নেওয়া রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হলেও, ২০২১-২০২২ সালে বেনেট-লাপিদ সরকারে রা’আম দলের অংশগ্রহণের নজির রয়েছে। নেতানিয়াহু আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন, লিকুদ পার্টি ২৭ আসন পেয়ে সবচেয়ে বড় দল হওয়ায় তিনি সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ দাবি করছেন।
সরকার গঠনের এই জটিল অঙ্কে অতি-ধর্মীয় ইহুদি দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের অবস্থান নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। এর আগে সামরিক বাহিনীতে অতি-ধর্মীয়দের বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির আইন পাসে ব্যর্থ হওয়ায় এই দল দুটি নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে সমর্থন প্রত্যাহার করেছিল। বিশ্লেষকদের মতে, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের একাংশ বিরোধী শিবিরের আইজেনকটের দিকে ঝুঁকতে পারে। তবে তাদের সমর্থন পেলেও বিরোধীদের অন্তত একটি আরব দলের সমর্থন নিতেই হবে।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠনের জন্য কাউকে দায়িত্ব দেবেন। যিনি দায়িত্ব পাবেন, তিনি ২৮ দিন (প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন) সময় পাবেন। তবে হারজগের সামনে শুধু সরকার গঠনের সিদ্ধান্তই নয়, নেতানিয়াহুর একটি গুরুত্বপূর্ণ আবেদনও রয়েছে। দুর্নীতি মামলায় দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার মুখে থাকা নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমার আবেদন করেছেন। ফলে হারজগকে একই সঙ্গে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট এবং নেতানিয়াহুর ক্ষমার আবেদনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
ইসরায়েলের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের ওপর প্রভাব ফেলছে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইসরায়েলের কিছু খাতে অর্থ সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় তা নেতানিয়াহু সরকারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলও ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের নীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনে নেতানিয়াহু পিছিয়ে থাকলেও ইরান ইস্যু সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়োসি মেকেলবার্গের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যদি কোনো জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতি বা সংঘাতের সৃষ্টি হয়, তবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিরোধী দলগুলো বাধ্য হয়ে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের সদস্যদের শপথ নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এর আগেই সরকার গঠনের কোনো সমঝোতা হবে কি না, নাকি ইসরায়েলকে আরেকটি নির্বাচনের দিকে এগোতে হবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের তীব্র রাজনৈতিক দর-কষাকষির ওপর।




