উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টায় দিল্লিতে ইরান-আমিরাত শীর্ষ বৈঠক
প্রকাশিত হয়েছে : ৮:০০:৩৮,অপরাহ্ন ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | সংবাদটি ৪ বার পঠিত
পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংঘাত ও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যেই ভারতের নয়া দিল্লিতে বৈঠকে বসেছেন ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ নেতারা। ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের মধ্যে এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের যুদ্ধ শুরুর পর এটিই দুই দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম বৈঠক।
এনডিটিভি লিখেছে, ভারতের মধ্যস্থতায় এই বৈঠক আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ের পাশাপাশি ‘উত্তেজনা প্রশমন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টাকে সমর্থন করার গুরুত্ব’ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
নয়া দিল্লিতে ইরানের দূতাবাসও বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে দুই নেতার একটি ছবি প্রকাশ করেছে। এমন এক সময়ে এই বৈঠক হল যখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি আরব তাদের গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ করে দেয়। আরব উপদ্বীপজুড়ে বিস্তৃত এই পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনার জেরে আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (অ্যাডনক) তেলের ট্যাংকারসহ বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
বৈঠকের ঠিক দুদিন আগে, বৃহস্পতিবার ইরানের সেনাবাহিনী কুয়েতের আহমেদ আল-জাবের বিমানঘাঁটি এবং ইউএই-র আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়।
এক বিবৃতিতে ইরানি সেনাবাহিনী ওই ঘাঁটিগুলোতে থাকা মার্কিন বাহিনীকে ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘শিশু-হত্যাকারী’ আখ্যা দিয়ে তাদের রাডার সিস্টেম ও সরঞ্জাম ধ্বংসের দাবি করে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট লিখেছে, গত মাসে আমিরাত উপকূলের কাছে পানিতে দুটি ইরানি ব্যালিস্টিক মিসাইল পড়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
এর জেরে আবুধাবি ইরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্যাপক বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা ইরানের জন্য ব্যাংকিং ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন আমিরাতের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যায়।
চীনের পর সংযুক্ত আরব আমিরাত হচ্ছে ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার। বার্ষিক ২৫ থেকে ২৭ বিলিয়ন ডলারের এই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ওপর ইরান ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ২০২৪ সালেও আমিরাত থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি দামে পণ্য আমদানি করেছে ইরান।
ইরান ও আমিরাতের এই বৈরী সম্পর্কের শেকড় বেশ গভীরে। তিনটি কৌশলগত দ্বীপ নিয়ে ১৯৭১ সাল থেকেই দুই দেশের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এছাড়া ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে মতাদর্শগত দ্বন্দ্বও প্রকট হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে এই দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হওয়ার অন্যতম কারণ হল আমিরাতে মার্কিন ও পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি।
আমিরাতের আল ধাফরা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন ও ফরাসি বাহিনী অবস্থান করছে, যা ইরানের জন্য সরাসরি উদ্বেগের কারণ। এছাড়া ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকেও তেহরান ‘ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখে আসছে।
সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান সবচেয়ে বেশি হামলা চালিয়েছে আরব আমিরাতে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তারা ইরানের ছোড়া ৪৫৭টি ব্যালিস্টিক মিসাইল, ১৯টি ক্রুজ মিসাইল এবং ২,০৩৮টি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই দুবাই বিমানবন্দর, বুর্জ আল-আরব হোটেল এবং জেবেল আলি বন্দরের মত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় মিসাইল হামলা হয়।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, আমিরাতের অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে ইরান মূলত প্রস্তাবিত ‘ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোর’ (আইএমইসি)-এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে চেয়েছে, যেখানে আমিরাত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এর মাধ্যমে ইরান হয়ত তাদের নিজেদের চাবাহার বন্দরকে লজিস্টিক হাব হিসেবে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে।
এতসব উত্তেজনার পরও শনিবার ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের মধ্যস্থতায় সদস্য দেশগুলো যৌথ ‘দিল্লি ঘোষণা’ গ্রহণে সম্মত হয়। এই ঘোষণায় আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি যে কোনো একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের নিন্দা জানানো হয় এবং উপসাগরীয় সংঘাতে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো রক্ষার জোর দাবি জানানো হয়।
ইরান ও আমিরাত–উভয় দেশই ব্রিকসের সদস্য। সংঘাতের এই কঠিন সময়ে ব্রিকসের মঞ্চ ব্যবহার করে দুই বৈরী প্রতিবেশীকে আলোচনার টেবিলে বসানোকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই দেখিয়েছে এনডিটিভি।




