শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ ব্যয় বাড়ল ৮৪৭ কোটি টাকা
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:০৮:২৮,অপরাহ্ন ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | সংবাদটি ১ বার পঠিত
ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নির্মান কাজ ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ নির্মাণ শেষ হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর এ টার্মিনাল আংশিকভাবে চালুরও ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু এর মধ্যেই আরও একবার প্রকল্পটির মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। শূন্য দশমিক সাত শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার আগেই ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ৮৪৭ কোটি টাকা। এছাড়া প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে আরও এক বছর।
সব মিলে তৃতীয় সংশোধনের পর প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়াল ২২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, মেয়াদ বেড়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
সচিবালয়ে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবনায় বলা হয়, এই প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৯৫ দশমিক ২৩ শতাংশ, বাস্তব অগ্রগতি ৯৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
সভা শেষে বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁও এর পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেক সভা বিষয়ে ব্রিফিং করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি ও মন্ত্রণালয় সচিব এসএম শাকিল আকতার।
এ সময় সাংবাদিকরা জানতে চান, তৃতীয় টার্মিনালের নির্মাণ কাজ অবশিষ্ট আছে এক শতাংশেরও কম। এই কাজের জন্য ৮৪৭ কোটি ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হল। সরকারের পক্ষে থেকে বলা হয়েছে ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করা হবে। এই সময় নতুন করে ব্যয় ও সময় বাড়ানোর যৌক্তিকতা ছিল কিনা?
এর ব্যাখ্যয় সচিব শাকিল আকতার বলেন, তৃতীয় টার্মিনালের মত জায়গায় ইন্টারনেট ফ্যাসিলিটি থাকতে হবে। হাই স্পিড ইন্টারনেট ফ্যাসিলিটি যদি মিসিং থাকে কিভাবে অপারেশন চলবে? প্রকল্পে ইমিগ্রেশনের ইন্সট্রুমেন্ট মিসিং ছিল। এই জিনিসগুলো মিসিং নিয়ে আমরা কিভাবে উদ্বোধন করব? ১৬ ডিসেম্বর আংশিক উদ্বোধন করব। কিন্তু যে কাজ না করলেই নয়, সেই কাজ শেষ করার জন্য ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানোর কথা বলেছি।
পরে এই বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি। তিনি বলেন, জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত ৩০ মাসের রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ৬৬৭ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। প্রকল্প চালু হয়নি কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ খরচ যাচ্ছে। এই কাজ এগিয়ে নেওয়ার বকেয়া শোধ করতে হবে। এছাড়া ঠিকাদারের পরিবর্তনজনিত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে আপস নিষ্পত্তি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ২৯৪ দশমিক ৬৬ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রকল্পের অবশিষ্ট কাজ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুবিধাগুলো, পণ্য পরিবহন ও ওঠানামা ব্যবস্থা, মালামাল ওঠানামা ব্যবস্থার পরীক্ষণ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন শোধনাগারের পরীক্ষণ, বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ সুপারভিশনের জন্য পরামর্শক ব্যয় ২০ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে প্রকল্পের সিডি, ট্যাক্স, ভ্যাটসহ জিওবি খাতে ব্যয় ১৩৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা কমেছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে ৮৪৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
ব্রিফিংয়ে বলা হয়, এ প্রকল্পসহ মঙ্গলবারের একনেক সভায় ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ১০ হাজার ১১৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ/অনুদান ৫ হাজার ২৫২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৩৮২ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
এসব প্রকল্পের মধ্যে আটটি নতুন, তিনটি সংশোধিত এবং দুটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ‘বাংলাদেশে যক্ষ্মা, এইচআইভি/এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জোরদার’ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। এতে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৩৯ কোটি ৬ লাখ টাকা।
এছাড়া পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পের মেয়াদ চতুর্থবার বাড়ানো হয়েছে। এ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৫৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং প্রথম সংশোধনে ৬৫১ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত।
আর্থিক খাতের জন্য ‘ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর সাপোর্ট প্রজেক্ট-২ (এফএসএসপি-২)’ নামে নতুন একটি প্রকল্পও অনুমোদন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদের এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বাড়াতেও নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে বিদ্যমান শারীরিক প্রতিবন্ধী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিষ্ঠান স্থাপন, সম্প্রসারণ ও সক্ষমতা শীর্ষক প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০৮ কোটি ৩০ লাখ টাকা। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
পানি ব্যবস্থাপনায়ও রয়েছে একাধিক প্রকল্প। ‘মাসদার রেগুলেটর নির্মাণসহ ছোট ফেনী এবং বামনী নদী অববাহিকায় সমন্বিত বন্যা ও নদী ব্যবস্থাপনা এবং নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (অংশ-১)’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৫১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকা রক্ষায় আরেকটি নতুন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬০৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
রংপুর বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণে নতুন প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৯৪৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের মেয়াদ জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩০ পর্যন্ত।
অন্যদিকে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী জেলার গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৬০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। প্রথম সংশোধনে তা ২ হাজার ১০৯ কোটি ১৭ লাখ এবং দ্বিতীয় সংশোধনে ২ হাজার ৫১২ কোটি ২ লাখ টাকা করা হয়। তৃতীয় সংশোধনে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা।
এছাড়া র্যাব বিলুপ্ত হয়ে নতুন গঠন হওয়া এসআরবির কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন প্রস্তাব রয়েছে। প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি মেয়াদও বাড়ানো হয়েছে।
অনুমোদনের তালিকায় বিদ্যুৎ খাতেও দুটি নতুন প্রকল্প রয়েছে। ফেনী জেলার সোনাগাজীতে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।
এ ছাড়া তিন পার্বত্য জেলায় বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে ২ হাজার ৯১০ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের নতুন প্রকল্প সভায় পাস হয়েছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি জরিপের মাধ্যমে তিনটি সিটি করপোরেশন, একটি পৌরসভা এবং দুটি উপজেলায় ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি স্থাপন প্রকল্প (২য় সংশোধিত) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। এর ব্যয় ১১০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।




