আইএমএফের সঙ্গে ৪৫০ কোটি ডলারের নতুন ঋণ আলোচনা
প্রকাশিত হয়েছে : ২:১৪:৩০,অপরাহ্ন ০৯ অক্টোবর ২০২৬ | সংবাদটি ৪ বার পঠিত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) আগের ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি ঋণ নিতে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ সরকার। প্রাথমিকভাবে ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে। নতুন কর্মসূচির শর্ত হিসেবে ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কার, করছাড় যৌক্তিক করা এবং সরকারি ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ঋণচুক্তি হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচির শর্ত চূড়ান্ত করতে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আগামী সোমবার থেকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হতে যাওয়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদল ওই সভায় অংশ নেবে।
নতুন ঋণ কর্মসূচিতে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, করছাড় পর্যালোচনা, বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা এবং সরকারি ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে। এসব সংস্কারের অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, আগের ঋণ কর্মসূচিতে যেসব সংস্কারের শর্ত ছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে নতুন কর্মসূচিতেও একই ধরনের শর্ত আসতে পারে। তাঁর মতে, নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নেও সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। জাতীয় স্বার্থেই এসব সংস্কার জরুরি। আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মসূচি সংস্কার বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও চাপ তৈরি করতে পারে।
জাহিদ হোসেন আরও বলেন, রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না থাকায় সরকারের ব্যয় মেটাতে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কর্মসূচি অনুমোদন করে আইএমএফ। এর আগে ২০২২ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ঋণ সহায়তা চেয়ে সংস্থাটির কাছে আবেদন করেছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে কর্মসূচির আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।
তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং সংস্কার বাস্তবায়নের কঠিন শর্ত বিবেচনায় বর্তমান সরকার পুরোনো কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন কর্মসূচির পথে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেয়। গত এপ্রিল মাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভায় বিষয়টি সংস্থাটিকে জানানো হয়। এরপর গত ৩ জুন নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠায় সরকার। আইএমএফও নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, আগের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতায়। পরবর্তী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। সরকার সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী।
নতুন ঋণ কর্মসূচির আলোচনায় বিনিময় হারকে আরও বাজারভিত্তিক করা, রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের কার্যক্রম পৃথক করা, বিভিন্ন ধরনের করছাড় পর্যালোচনা, দেউলিয়াবিষয়ক আইনি কাঠামো প্রণয়ন এবং জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত সংস্কারও আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রের দাবি, এসব সংস্কারের বেশির ভাগই আগের ঋণ কর্মসূচিতেও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়নি। নতুন কর্মসূচির আওতায় সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের জন্য বাড়তি সময় ও নতুন সময়সীমা নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ৫৫০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচির অর্থ পাওয়ার কথা ছিল। তবে কিস্তি ছাড়ের সঙ্গে বিভিন্ন অর্থনৈতিক সংস্কারের শর্ত যুক্ত ছিল। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাঠামো পুনর্গঠন করে রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের দায়িত্ব আলাদা করার বিষয়টি ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার শর্ত থাকলেও তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারি করেছিল। বর্তমান সরকার সেটিকে আইনে রূপ দেওয়ার আগে বিষয়টি পর্যালোচনার উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন করছাড় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। জাতীয় রাজস্ব আদায় বাড়াতে প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অতিরিক্ত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশের সমপরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহের শর্তও ছিল। এসব ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ব্যাংক খাতে কিছু পরিবর্তন এলেও বিনিময় হার পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার শর্ত বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন প্রণয়ন এবং পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি; বরং ভর্তুকির পরিমাণ বেড়েছে।
এদিকে আগামী নভেম্বর মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সফরে ঋণের শর্ত ও সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। এরপর দর-কষাকষি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং সামনে আরও বৈঠক হবে। সরকার কর্মসূচিটি এগিয়ে নিতে আগ্রহী। ব্যাংককে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় এ বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা করছে মন্ত্রণালয়।
নতুন ঋণ কর্মসূচির চূড়ান্ত রূপ নির্ভর করবে দুই পক্ষের আলোচনার ফল, সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা এবং ঋণের শর্ত নিয়ে সমঝোতার ওপর। চুক্তি হলে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতে কাঠামোগত পরিবর্তন বাস্তবায়নের চাপও বাড়বে।




