নতুন আইনে যাত্রা শুরু বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:৫০:১৫,অপরাহ্ন ২৯ অক্টোবর ২০২৬ | সংবাদটি ৭ বার পঠিত
দীর্ঘ ২৫ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়। নতুন আইন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও সময়োপযোগী বিষয় চালুর পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে চলতি ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষেই গুচ্ছ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, কম্পিউটার সায়েন্স ও ফিনটেকসহ নয়টি আধুনিক বিষয়ে পাঠদান শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) দুপুরে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী একাডেমিক ভবনে সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রথমবারের মতো আয়োজিত মতবিনিময় ও সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কুদরত-ই-জাহান।
২০০১ সালের আইন থেকে নতুন বাস্তবতা
বগুড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সূচনা ২০০১ সালে। সে সময় ‘বগুড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে আইন পাস হলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়িত হয়নি। অবশেষে নতুন আইনের মাধ্যমে বিশ্ব বিদ্যালয়টিকে বৃহত্তর পরিসরে বহুমাত্রিক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য জানান, ২০২৫ সালের ৪ জুন তিনি উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিধি ও কাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। গত ১৬ জুলাই নতুন আইনের গেজেট প্রকাশিত হয় এবং ১৯ জুলাই আইনটি কার্যকর হয়। ২০০১ সালের আইনের সঙ্গে বর্তমান আইনের প্রায় ৯৯ শতাংশ পার্থক্য রয়েছে বলে জানান তিনি।
উপাচার্যের ভাষ্য, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। তবে গত আড়াই মাসে একাডেমিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নয়টি আধুনিক বিষয়ে পাঠদানের পরিকল্পনা
চাকরির বাজারের চাহিদা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক পর্যায়ে এআই, রোবোটিক্স, কম্পিউটার সায়েন্স ও ফিনটেকসহ নয়টি আধুনিক বিষয়ে পাঠদান শুরুর যৌক্তিকতা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
উপাচার্য বলেন, ইউজিসির চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া গেলে মার্চে নির্ধারিত গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রম শুরু করা হবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম গতিশীল করতে জরুরি ভিত্তিতে চারজন কর্মকর্তা ও সাতজন কর্মচারীসহ মোট ১১ জনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৭ সদস্যের সিন্ডিকেটের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জন সদস্য পাওয়া গেছে। অন্তত নয়জন সদস্য নিয়ে প্রয়োজনীয় ফোরাম পূর্ণ হলে সিন্ডিকেট ও একাডেমিক কাউন্সিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথা জানিয়েছেন উপাচার্য।
অস্থায়ী ক্যাম্পাস নির্বাচনের ক্ষেত্রে শহরের যানজট এড়িয়ে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্মার্টবোর্ড যুক্ত শ্রেণিকক্ষ, কম্পিউটার ল্যাব, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিরাপদ পানির সুবিধা রয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
এদিকে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন ও অধ্যাপক মুনিয়ারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে বলে জানানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন উপাচার্য। তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় হলো জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা। একজন খারাপ শিক্ষক ৫০ বছর বিশ্ববিদ্যালয়কে ভোগায়।”
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, স্বজনপ্রীতি কিংবা সুপারিশের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে না। যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীরাই নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম ঠেকাতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের কথাও জানান তিনি।
সাংবাদিকতা বিভাগসহ নতুন দাবি
সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন বগুড়ার বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
বগুড়া টেলিভিশন রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মোহন আখন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক অনুমোদন, প্রস্তাবিত নয়টি বিভাগ, ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি এবং মেধাভিত্তিক স্বচ্ছ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত চূড়ান্ত করার আহ্বান জানান।
বগুড়া প্রেস ক্লাবের সভাপতি রেজাউল হাসান রানু বলেন, উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও বঞ্চনার ইতিহাস বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক কাঠামো সাজাতে হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্বাচনে প্রাকৃতিকভাবে মনোরম পরিবেশ ও সমন্বিত ক্যাম্পাসের পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এআই ও ডেটা সায়েন্সনির্ভর আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ দেন।
অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক প্রতিনিধি মেহেরুল সুজন বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগ চালুর প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, এ উদ্যোগ উত্তরাঞ্চলে পেশাদার সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম শিক্ষা ও গবেষণার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়নের পথে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন যাত্রাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, শুধু আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো গঠনেই সীমাবদ্ধ না থেকে দ্রুত ভর্তি কার্যক্রম, মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক বিভাগ চালু এবং স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের উদ্যোগ দৃশ্যমান হবে।
সাংবাদিকতা বিভাগ চালুর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. কুদরত-ই-জাহান জানান, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিভাগটি অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে বগুড়া বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানের মডেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার পর বগুড়ায় উচ্চশিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন নতুন আইনের প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবে রূপ দেওয়া, প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু করাই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




