জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংসদে ঐকমত্যহীনতা, আলোচনা ‘টকড আউট’
প্রকাশিত হয়েছে : ১১:০৩:১২,অপরাহ্ন ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | সংবাদটি ৫ বার পঠিত
জুলাই জাতীয় সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে জাতীয় সংসদে নির্ধারিত দুই ঘণ্টার বেশি মুলতবি আলোচনার পরও কোনো সুনির্দিষ্ট পথরেখার বিষয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐকমত্য হয়নি।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ সংবিধানের ভেতরেই আছে; সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই তা করতে হবে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছেন, গণভোট ও বাস্তবায়ন আদেশে যে কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেটি এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
রোববার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধিতে আনা মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ প্রস্তাবটি ‘টকড আউট’ ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, “পার্লামেন্টারি পরিভাষায় একে বলা হয় টকড আউট। মোশন হ্যাজ বিন টকড আউট, এজ টুডেইজ মোশন হ্যাজ অলসো বিন টকড আউট।”
এরপর সংসদের বৈঠক সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তা নিয়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক বুধবার মুলতবি প্রস্তাবটি আনেন।
স্পিকার রোববার দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে এ নিয়ে অনধিক দুই ঘণ্টা আলোচনার সময় নির্ধারণ করে দেন।
মুলতবি প্রস্তাব হল সাম্প্রতিক, খুব জরুরি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনার জন্য চলমান অধিবেশনের নির্ধারিত কার্যসূচি স্থগিত রাখার একটি সংসদীয় প্রস্তাব। এর মাধ্যমে জরুরি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও বিতর্কের সুযোগ তৈরি হয়।
এদিন নোয়াখালী-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক প্রস্তাব উত্থাপন করে বলেন, “কার্যপ্রণালী বিধির ৬২ বিধি অনুসারে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করছি।”
তিনি বলেন, “‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ ভবিষ্যতের পথরেখা’ একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন-কানুন প্রণয়ন, সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জনের বিষয়ে প্রস্তাব সংক্রান্ত।
“সে কারণে উক্ত জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি কি হবে, সেই বিষয়ে সংসদ মুলতবি রেখে আলোচনার জন্য আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।”
তার বক্তব্যের পর স্পিকার যশোর-৫ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী এনামুল হককে বক্তব্য দিতে আমন্ত্রণ জানান।
আগের প্রস্তাবের নিষ্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন
আলোচনার শুরুতেই গাজী এনামুল হক প্রশ্ন তোলেন, ৩০ মার্চ একই ধরনের একটি প্রস্তাব উঠেছিল, কিন্তু তার কোনো নিষ্পত্তি সংসদ জানতে পারেনি।
তিনি বলেন, ৬৩ বিধিতে একই অধিবেশনে একই বিষয়ে পুনরায় আলোচনা না করার কথা আছে।
এনামুল হকের ভাষায়, “সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হল যে জুলাই সনদকে ভিত্তি করে সংবিধান সংস্কার বিষয়ে একটি ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছিল, সেই বিষয়টি পাশ কাটিয়ে সংস্কার শব্দটি পর্যন্ত আনা হয় নাই।”
তিনি বলেন, গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে, সংশোধনের জন্য নয়।
এনামুল হকের ভাষায়, “গণরায়কে পর্যন্ত আজকে উপেক্ষা করা হচ্ছে।”
বিরোধী বেঞ্চের আপত্তি
রংপুর-৪ আসনের জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার আগের প্রস্তাবকে আইন প্রণয়ন-সংক্রান্ত বলে নাকচ করা হয়েছিল, কিন্তু আজ সরকারি দলের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সে যুক্তি ধরা হয়নি।
তার ভাষায়, “আজকে যে প্রস্তাবটি তিনি এখানে উত্থাপন করেছেন সেই প্রস্তাবটি উত্থাপন হওয়ার যোগ্য প্রস্তাবই নয়।”
জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলটির এই নেতা দাবি করেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে আগেই আলোচনা শেষ হয়েছে।
“সংস্কারের যে ঘোড়া সে ঘোড়া অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। সেই ঘোড়াকে এখন লাগাম পরানোর চেষ্টা করছে।”
তিনি বলেন, সরকারদলীয় সদস্যরা ‘জুলাই সনদ, আদেশ, অধ্যাদেশ, গণভোট, সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ এই পুরো কাঠামোর বদলে শুধু সনদের কথাই বলছেন সরকারি দলের সদস্য।
‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ তর্ক
চট্টগ্রাম-৫ আসনের বিএনপির মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, জুলাই সনদের ৬ নম্বর অংশে ‘সংবিধান সংশোধন সাপেক্ষে সংস্কারের বিষয়সমূহ’ বলা আছে।
“আমার দৃষ্টিতে যেটা ভয়েড অ্যাব ইনিশিও, এটার কোনো আইনি ভিত্তিই নেই।”
ল্যাটিন ভাষার আইনি এ শব্দগুচ্ছ দিয়ে বোঝায়, কোনো চুক্তি, দলিল বা আইনি পদক্ষেপ তৈরির সময় থেকেই কোনো আইনি ভিত্তি বা কার্যকরিতা ছিল না। অর্থাৎ, আইন এটিকে এমনভাবে গণ্য করে যেন তা কখনোই সৃষ্টি বা সম্পন্ন হয়নি।
সরকারি দলের এই সদস্য প্রশ্ন করেন, “সেটাকে (জুলাই সনদ) নিয়ে আলোচনা করে জনগণকে বিভ্রান্ত করে, জনগণের মনে একটা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোটা জুলাইয়ের স্পিরিটের সাথে কতটুকু যায়?”
‘সংস্কার’ আর ‘সংশোধন’ নিয়ে তর্ক
ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘সংস্কার’ আর ‘সংশোধন’ নিয়ে ‘প্লেয়িং উইথ ওয়ার্ডস’ বা শব্দের খেলা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা তো চাচ্ছি যে জুলাইয়ের যেই জিনিসগুলো আছে, সেগুলো সংবিধানের মধ্যে আসবে এবং সংবিধানের রীতিনীতি মেনেই আসবে।”
এই সদস্যের মতে, জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে কেউ কেউ নাকি জুলাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা অসত্য।
গণভোটের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন
পাবনা-১ আসনের জামায়াতের মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান গণভোটের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, জনগণ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে।
তিনি বলেন, “আপনারা যদি গণভোটে বিশ্বাস করেন, জনগণের ক্ষমতায় বিশ্বাস করেন, জনগণ এই জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়েছে।”
বিরোধী দলের এ সদস্যের ভাষায়, “সংসদের এখতিয়ার নেই কোনো আদেশকে নিজে থেকে অবৈধ বলার; সেই এখতিয়ার হাই কোর্টের।”
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ মেনে সংস্কার পরিষদ গঠন না করা জনগণের ক্ষমতাকে ‘অবজ্ঞা’ করার সামিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
‘আমরা জুলাই সনদের বিরুদ্ধে না’
প্রস্তাবকারী জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, “আমরা জুলাই সনদের বিরুদ্ধে না। জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে আমরা পালন করতে চাই। কিন্তু পদ্ধতিটা কি হবে?”
তিনি দাবি করেন, তার দল জুলাই সনদের ‘একটা অক্ষরও’ বাদ দিতে চায় না। জুলাই সনদের ‘খুঁটিনাটি’ সকল বিষয়ে সংবিধানে ‘অন্তর্ভুক্ত’ করার পক্ষেই তারা।
আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি জুলাই সনদেই ব্যাখ্যা করা আছে।
তার ভাষায়, “জুলাই জাতীয় সনদ স্বব্যাখ্যায়িত। …জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতিটাই হল জুলাই জাতীয় সনদ ইটসেলফ। এখানে অন্য কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নাই।”
গণভোটের তফসিল নিয়ে প্রশ্ন তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, “এটা হল ফ্রড অন দি কনস্টিটিউশন।”
তার ব্যাখ্যায়, জুলাই সনদের প্রতিটি স্তরেই সংবিধানকে সামনে রেখে সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। তিনি বলেন, “সংবিধানের প্রতিটি সংশোধনীই সংস্কার, কিন্তু প্রতিটি সংস্কারই সংশোধনী নয়।”
আইনমন্ত্রীর মতে, রাজনৈতিকভাবে সংস্কারের দাবি উঠতে পারে, কিন্তু সংসদে এসে তা আইনি রূপ নিলে সেটি হবে সংবিধান সংশোধন, এবং তা ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ীই করতে হবে।
তিনি বলেন, “আমরা বারবার বলছি, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনীতি করার দরকার নাই। …আসুন জুলাই সনদের পথ ধরে হাঁটি।”
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, তাদের দল জুলাই সনদের বিরুদ্ধে নয়, বরং বাস্তবায়নের পথ নিয়ে আপত্তি আছে।
তিনি বলেন, “আমরা অর্ডার মানি, আমরা অভ্যুত্থানের বাস্তবতা মানি, আমরা গণভোট মানি, আমরা গণভোটের মাধ্যমে যে সংস্কার পরিষদ হওয়ার কথা তা মানি, আমরা প্রয়োজন ক্ষেত্রে সংবিধানের সংশোধন মানি, আমরা জুলাই সনদ সুন্দরভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টা মানি।”
তার ভাষায়, “কোনো জায়গায় অমান্যের কোনো জায়গা আমাদের পক্ষ থেকে নেই।”
তবে বিরোধীদলীয় নেতা প্রশ্ন তোলেন, ৩০ মার্চের আগের প্রস্তাবের নিষ্পত্তি না জেনে কীভাবে একই ধরনের আরেকটি প্রস্তাব আলোচনায় আনা হল?
তিনি বলেন, “অনিষ্পন্ন একটা বিষয়ে প্রস্তাব থাকা অবস্থায় আরেকটা মুলতবি প্রস্তাব আসতে পারে কি না, আমি এই কার্যপ্রণালী বিধি পড়ে এটা বুঝতে পারি নাই।”
একই সঙ্গে তিনি বলেন, সংবিধান সংশোধন ও আইন প্রণয়নের কাজে তাদের সহযোগিতা থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাল্টা অবস্থান
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সংসদ নেতার পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বলেন, “সংবিধান হয় রহিত, স্থগিত, সংশোধন, বাতিল। সংবিধান তো সংস্কার হয় না।”
তার বক্তব্য, জুলাই জাতীয় সনদের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকলেও, জনগণের অভিপ্রায়কে চূড়ান্ত রূপ দিতে হলে তা সংবিধানে আনতেই হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, “অভিপ্রায়কে সংবিধানে ধারণ করার জন্য এই সংসদে আসতে হবে, সংশোধন নিয়ে আসতে হবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রস্তাব দেন, সংবিধান সংশোধন নিয়ে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি করা হোক, যেখানে সব দল বসে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পথ বের করবে।
‘টকড আউট’
আলোচনার শেষদিকে মাইক বিভ্রাটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একাধিকবার থেমে যায়।
পরে স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতার আগের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ৩০ মার্চের প্রস্তাবটিও কার্যত আলোচনার মধ্যেই শেষ হয়েছিল।
তার ভাষায়, “এটা হলো এই মুলতবি প্রস্তাবে স্বাভাবিকভাবে সমাপ্ত হয়েছে। এবং পার্লামেন্টারি পরিভাষায় একে বলা হয় টকড আউট।”
রোববারের আলোচনাও একইভাবে সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হয়।




