থামছে না দখল, উচ্ছেদের পরও ফুটপাতে দোকান
প্রকাশিত হয়েছে : ১০:৫৪:৫৮,অপরাহ্ন ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | সংবাদটি ৩ বার পঠিত
রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাতের অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের পরপরই কেউ আবার বসে পড়ছেন। ‘ঝামেলা এড়াতে’ আগের মতো পুরোদমে দোকান না খুললেও স্বল্পপরিসরে ব্যবসা চালাচ্ছেন তারা।
আবার কেউ অপেক্ষা করছেন দোকান খোলার, ভাবছেন পুলিশের ‘তোড়জোড়’ শেষ হলে কোনো ‘উপায় বের হবেই’। ঢাকার এই উচ্ছেদ অভিযান যেন চিরায়ত ‘ইঁদুর দৌড় খেলাতেই’ সীমাবদ্ধ।
পুলিশ বলছে, ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করলেও একার পক্ষে সেই অবস্থা তাদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য তারা সরকারের অন্যান্য সংস্থা ও সাধারণ নাগরিকের সহায়তা চান।
তবে দখলমুক্ত রাখতে তারা চলমান ‘সর্বোচ্চ চেষ্টার’ পাশাপাশি ‘ফলোআপ অভিযান’ চালানোর কথাও বলেছেন।
ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের ১৫ দিনের মাথায় ২ মার্চ ঢাকার যানজট নিরসনে ট্রাফিক ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এরপর ২৪ মার্চ সচিবালয়ে ‘ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ শীর্ষক বিশেষ সভায় প্রধানমন্ত্রী একগুচ্ছ নির্দেশনা দেন। সেদিন সভায় সড়ক দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্তও হয়।
এর আগের দিনই পুলিশ গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে মার্চের মধ্যে ঢাকার ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেয়। অন্যথায় পহেলা এপ্রিল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল জরিমানা করা হবে বলে হুঁশিয়ার করা হয়।
সে অনুযায়ী পহেলা এপ্রিল বুধবার থেকে রোববার পর্যন্ত ঢাকার সবকটি বিভাগে দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদের কথা বলা হয়।
এরমধ্যে শুক্রবার বাদে এই চার দিনের অভিযানে মোট ১১ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায়সহ বিভিন্ন মেয়াদে জেল দেওয়া হয় ৬০ জনকে।
বিশেষ এই অভিযান চলাকালীন শনিবার ঢাকার মোহাম্মদপুরের টাউনহল এলাকা থেকে বসিলা পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান চালায় পুলিশ।
কিন্তু পরদিন রোববারই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গিয়ে দেখা গেল বসিলামুখী সড়কের একপাশে সারি সারি ভ্যানগাড়ি। সেগুলোতে বিভিন্ন ফল, সবজির পসরা সাজিয়ে স্বাভাবিক সময়ের মতোই বিক্রি করছিলেন।
এদের একজন কলা বিক্রেতা রবিউল বলেন, ‘শনিবার বেলা ১১টার দিকে পুলিশ উচ্ছেদের জন্য এসেছিল। তখন পুলিশের তোড়জোড় দেখে তারা নিজেরাই ভ্যান নিয়ে চলে যান। সকালে আবার বসার পরে পুলিশ বাধা দিলে চলে যান। পরে আবার ভ্যানসহ এসে কলা বিক্রি করছেন।’
তিনি বলেন, “গরীব মানুষ আমরা, কেনাবেচা না করলে খামু কী? আর না বেঁচতে পারলে কলা পইচা যাইব। অন্যকিছু হইলে না হয় দুই দিন না আইলাম। এখন কলা পচলে পুঁজিও শেষ হইয়া যাইব।”
পুলিশ আবার এসে বাধা দিলে চলে যাবেন, যতক্ষণ সুযোগ পান ততক্ষণ এভাবেই ব্যবসা চালানো ছাড়া তার উপায় নেই বলে তুলে ধরেন তিনি।
বাসস্ট্যান্ড মোড়েই আল্লাহ করিম মসজিদ মার্কেটের সামনে বেশ কয়েকটি চৌকি পলিথিন মোড়ানো দেখা যায়। একটি চৌকির পাশেই কাউছার নামে একজন বসে আছেন, বললেন দোকানটি তারই।
শনিবার পুলিশ এসে তাদের সরিয়ে দেওয়ায় রোববার সেটি খোলেননি। তবে পাশেই মার্কেটের কিছুটা ভেতরের দিকে সারিবদ্ধভাবে আপেল, কমলা, মাল্টা, আঙ্গুরসহ নানান ফল সাজিয়ে বিক্রির চেষ্টা করছেন।
কাউছার বলেন, “আমরা দোকান দেওয়ার পরও ফুটপাত পুরাটা ফাঁকা, তারপরও পুলিশ আইসা আমাগো লগে ঝামেলা করে। আমরা একপাশে ওইটা সমস্যা আর রাস্তার মধ্যে দোকান বসাইয়া যে রাস্তা বন্ধ কইরা দেয় ওইটাতে সমস্যা নাই।”
তিনি তখন প্রধান সড়কের একপাশে সারিবদ্ধভাবে বসানো দোকানগুলো দেখিয়ে দেন।
এভাবে কতদিন চলবে জানতে চাইলে ফুটপাতের এই ব্যবসায়ী বলেন, “আশা করি দুই-একদিনের মইধ্যেই ঠিক হইয়া যাইব। মার্কেট কমিটির লগে কথা কইছি। বাকিটা দেখা যাক।”
এখানে দোকান চালানোর জন্য দিনপ্রতি ২০০ টাকা মার্কেট কমিটিকে দিতে হয় বলেও জানান তিনি।
শ্যামলী রিংরোড এলাকায় বৃহস্পতিবার অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে স্থাপিত দোকানপাট, দোকানের বর্ধিতাংশ এবং বিভিন্ন মালামাল উচ্ছেদ করার কথা বলে পুলিশ।
এর দুইদিন পর রোববার শিয়া মসজিদ থেকে জাপান গার্ডেন সিটি পর্যন্ত সড়কের একপাশে আগের মত অসংখ্য দোকান দেখা যায়নি। তবে কিছুটা দূরে দূরে কিছু দোকানপাটের টেবিলসহ কাঠের জিনিসপত্র স্তূপ করে রাখতে দেখা গেছে। আবার কিছু দোকানপাটগুলো পলিথিন দিয়ে মোড়ানো গোছানো অবস্থায় দেখা গেছে।
এদিন চায়ের দোকানগুলোর মধ্যে কয়েকজন দোকানি স্বল্প পরিসরে কেটলিতে করে চা আর ফুটপাতেই সিগারেটের প্যাকেট সাজিয়ে বসেছেন।
তাদেরই একজন নিলুফা বললেন, “একদিন দোকান না চালাইলেই খাওয়া বন্ধ হইয়া যায়। এরমধ্যে তিন দিন ধইরা দোকান করতে পারতাছি না। এমনেই আসছি, টুকটাক যদি বেচাকেনা হয় দেখি।”
এই দোকান খোলা-বন্ধের ঝামেলা এবারই প্রথম নয় এই নারীর কাছে। তার ভাষ্য, প্রায়ই এভাবে উঠিয়ে দেওয়া হয়, পরে আবার ঠিক হয়।
এবারও আবার পরিস্থিতি ‘ঠিক হয়ে যাবে’ এবং তিনি সেখানে একইভাবে দোকান পরিচালনা করতে পারবেন বলে বিশ্বাস তার।
এসব এলাকায় অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া ডিএমপির তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মো. রফিকুল ইসলামও স্বীকার করলেন অভিযান শেষে আবার ফুটপাতে বিভিন্ন দোকানির এসে বসে যাওয়ার কথা।
তিনি মানছেন, জায়গাটা খালি করার পরে আবার কেউ কেউ এসে বসে যাচ্ছে। এর আগের অভিযানগুলোতেও এমন চিত্র দেখা গেছে।
ফুটপাত ও সড়ক অবৈধ দখলমুক্ত রাখা ‘পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব না’ মন্তব্য করে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, “সর্বস্তরের অংশগ্রহণ থাকা লাগবে, সহযোগিতা লাগবে। যে জায়গাটা খালি করা হচ্ছে সেখানে যেন আর কেউ বসতে না পারে সেজন্য সিটি করপোরেশনসহ অন্যান্য সংস্থাগুলোকেও যার যতটুকু ভূমিকা এগিয়ে আসতে হবে। বাসিন্দাদেরও সচেতন হতে হবে। সেখানে যেন আবার আস্তানা গাড়তে না পারে।”
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে ‘ফলোআপ অভিযান’ চালানোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা এখন বিষয়টিকে সফটলি হ্যান্ডেল করছি। আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি। পরে ফলোআপ অভিযান হবে, তখন যারা নির্দেশ মানবে না কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হবে।”
একইভাবে উচ্ছেদ অভিযান চালানো ফার্মগেট, মহাখালী এলাকায় গিয়েও রোববার একই চিত্র দেখা গেছে।
মহাখালী আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের সামনে রুবেল নামে একজন প্লাস্টিকের জিনিসপত্র, তোয়ালেসহ নানান সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
তার বাবাও এ জায়গাতে দোকান করে আসছেন, এখন তিনি করছেন- এমন দাবি করে তিনি বলেন, “কালকে পুলিশ আসছিল ওঠায়ে দিছে। মালামাল নিয়া চইলা গেছি, কী করুম? আইজকা আবার আইছি। ব্যবসা না করলে খামু কী?”
মহাখালী কাঁচাবাজারের সামনের এলাকাতেও ফুটপাতের বিভিন্ন দোকানের চৌকিগুলোকে স্তূপ করে রেখে দিতে দেখা গেছে। আমতলী এলাকায় দোকান উচ্ছেদের পরে ফ্লাক্সে করেই চা বিক্রি করতে দেখা গেছে কয়েক দোকানিকে।
শনিবার মহাখালী কাঁচাবাজার, আমতলী, চেয়ারম্যান বাড়ি এবং গুলশান ২ নম্বর এলাকায় অভিযান চালানো হয়।গুলশান ট্রাফিক বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়, অভিযানে স্বচ্ছল দোকানদারদের দোকানের অবৈধভাবে স্থাপিত বর্ধিত অংশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা এবং পথচারীদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে অভিযান চালানো হয়েছে।
অভিযানের কথা শুনে শনিবার অনেক চা দোকানিই দোকান সরিয়ে রেখেছেন, রোববার আবার একই জায়গায় দোকান নিয়ে বসেছেন।
রুবেল নামে এক চা দোকানি বললেন, “অভিযানের কথা হুইনা আগেই দোকান সরাইরা রাখছিলাম।”
তার মতে, এবার অভিযানে যেহেতু তাদের সরাতে পারেনি, এখন দোকান করতে আর কোন ‘সমস্যা হবে না’।
তবে গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার মিজানুর রহমান বলছিলেন, তারা মূলত স্থায়ী দোকানগুলোর তরফে ফুটপাত দখল করে রাখা অংশগুলো উচ্ছেদে কড়াকড়ি অভিযান চালিয়েছেন।
আর যারা হকার বা অস্থায়ী দোকানি, তাদের সমস্যা স্থায়ী সমাধানের পথ খোঁজা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমরা মূলত বড়লোকের দোকানগুলোর বর্ধিত অংশ যেমন, তার হোটেল আছে বাইরে কড়াইটা রেখে দিয়েছে সেগুলো মূলত লক্ষ্য করেছি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে যেখানে যেমন প্রয়োজন আইন প্রয়োগ করা হয়েছে।”
পুলিশের এ কর্মকর্তাও উচ্ছেদের পরই আবার দখল হয়ে যাওয়ার ‘প্রয়াসের’ কথা মেনে নিয়ে বলেন, “মনিটরিং করছি, ফলোআপের প্ল্যান আছে। পরে যদি আবার এমনটি করা হয় তাহলে ডাম্পিং করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে আরও ‘বিস্তৃত পরিসরে’ পুলিশের পরিকল্পনা থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আসল হকার যারা, তাদের বিষয়ে অনেকগুলা প্ল্যান হচ্ছে। আশা করছি সিদ্ধান্তগুলো ওই দিকে যাবে। হকার আসলে কারা, তারও সংজ্ঞা থাকা উচিৎ।”
যার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, জীবীকার জন্য ‘রি-লোকেশন’ যাতে করা যায় সেই চেষ্টা করার কথাও বলেন তিনি।
পুলিশের এই উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে বেশিরভাগ নাগরিকই স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তবে সেটিকে ধরে রাখাটিকে বরাবরের মতই চ্যালেঞ্জ মনে করছেন তারা।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম বলেন, “জাপান গার্ডেন সিটি ও টোকিও স্কয়ারের সামনের ফুডকোর্ডগুলো না থাকায় একটু দম নিয়ে চলাচল করা যাচ্ছে। খুব ভালো উদ্যোগ, তবে এটি যেন বহাল থাকে।”
বিশ্বজিৎ ভৌমিক নামে এক বাসিন্দা বলেন, “পুলিশ চাইলেই সব পারে। তবে এই উচ্ছেদ অভিযানগুলো চলমান রাখার জন্য রাজনৈতিক ও পুলিশের সদিচ্ছার প্রয়োজন।”
এদিকে সরকারের দায়িত্বশীলদের তরফেও বিকল্প কর্মসংস্থান না করে উচ্ছেদ অভিযান না চালানোর পক্ষে মত এসেছে।
বৃহস্পতিবার নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম বলেন, তিনি হুটহাট করে ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ ও অটোরিকশা বন্ধের পক্ষে নন।
তিনি বলেন, “ফুটপাত থেকে হকার ও অটোরিকশা হুট করে উচ্ছেদ করা যাবে না। তাদের জন্যে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসকের ভাষ্য, “প্রধানমন্ত্রী যেটা চান, শুধু হুট করে উচ্ছেদ করলে হবে না। এদের একটা বিকল্প ব্যবস্থাও করতে হবে। সেটার জন্য ঢাকা শহরে আমরা ৮টা নৈশ মার্কেট করার চিন্তা করছি।”




