গুজবের পিটুনিতে বাবা নিহত, দুই বছরেই পুরোপুরি এতিম মুসলিমা
প্রকাশিত হয়েছে : ১১:০৭:৪৮,অপরাহ্ন ০২ মে ২০২৬ | সংবাদটি 0 View
জন্মের ২১ দিনের মাথায় মা ছেড়ে চলে যান। আর দুই বছর বয়সে পিটুনিতে মারা গেলেন বাবা ট্রাকচালক হান্নান শেখ (৪৫)। ফলে পুরোপুরি এতিম হয়ে গেল ফরিদপুরের ছোট্ট শিশু মুসলিমা ইসলাম (২)। এখন তার ভরসা শুধু বৃদ্ধ দাদা-দাদি, যাঁদের চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে শোকের অশ্রু। সেই সঙ্গে ছোট্ট মুসলিমার ভবিষ্যৎ নিয়ে পড়েছেন গভীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায়।
গতকাল শুক্রবার রাতে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া বাজার এলাকার নতুন হাটখোলা এলাকায় গুজব ছড়িয়ে পিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় ট্রাকচালক হান্নান শেখকে। তিনি উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামের বাসিন্দা শহিদ শেখের ছেলে।
ঘটনার পর থেকে হান্নান শেখের বাড়িতে এখন চলছে মাতম। তাঁকে হারানোর পাশাপাশি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, তাঁর দুই বছরের একমাত্র মেয়ে মুসলিমার কী হবে? অবশ্য মুসলিমা সারা জীবনের জন্য কী হারাল, তা বোঝার বয়স এখনো হয়নি। স্বজনদের কান্না আর মানুষের ভিড়ের মধ্যেই কিছু না বুঝে কখনো দাদির কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে সে। ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে উঠছে।
নিহত ট্রাকচালক হান্নানের পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা আরিফা বেগম মুসলিমার জন্মের ২১ দিন পর স্বামীকে তালাক দিয়ে চলে যান। এর পর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমই শিশুটিকে লালন-পালন করে আসছেন। নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি মরে গেলে এই বাচ্চার কী হবে?’
ছেলে হান্নান শেখকে হারিয়ে দিশাহারা বাবা শহিদ শেখ। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিল। সে অপরাধ করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এখন এই শিশুর ভবিষ্যৎ কী? ওকে দেখবে কে? এ কথা ভেবে ভেবে দুই চোখে অন্ধকার নেমে আসে।’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় দ্রুতগতির একটি ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে ‘ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে’—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয় বাসিন্দারা রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। পরে চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় চালক হান্নানের দুই সহকারী নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে বর্তমানে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে নিহত হান্নানের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম রসুল সামদানী আজাদ বলেন, ‘আমরা নিহতের পবিবারকে হত্যা মামলা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি। মামলা হবে। তারা জানিয়েছে, লাশ দাফন শেষে তারা মামলা দেবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার রং চড়িয়ে কে কীভাবে উসকিয়েছে, সেসব ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। মামলা হওয়ার পর এ বিষয়ে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
একই তথ্য জানান নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মাহমুদুল হাসান।




