দেশের সরকারি হাসপাতালে ৬২ শতাংশ অক্সিজেন প্লান্টই অচল
প্রকাশিত হয়েছে : ১২:২৮:৫৫,অপরাহ্ন ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | সংবাদটি ৩ বার পঠিত
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্থাপিত ৯৯টি অক্সিজেন প্লান্টের মধ্যে ৬১টিই বর্তমানে অকার্যকর, যা মোট প্লান্টের প্রায় ৬২ শতাংশ। দক্ষ জনবল ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই প্লান্টগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। এর ফলে রোগীদের জীবন বাঁচাতে সিলিন্ডার বা তরল অক্সিজেন কিনতে সরকারকে বাধ্য হয়ে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) শুরু হওয়া দুই দিনের ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর প্রথম দিন উপস্থাপিত একাধিক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার এই করুণ চিত্র উঠে এসেছে।
সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারির সময় অক্সিজেনের সংকট মেটাতে দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতাল, ২৮টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও ৭টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯টি অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এবং এডিবির ঋণে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে ৭০টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়।
মূল্যায়নে দেখা গেছে, সিএমএসডির মাধ্যমে স্থাপিত এই ৭০টির মধ্যে মাত্র ৯টি বর্তমানে চালু আছে। বাকি ৬১টির মধ্যে ৩১টি কারিগরিভাবে সম্পূর্ণ অচল এবং ৩০টি সচল থাকলেও তা নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে না।
সরকারি এই প্লান্টগুলো সেবার বাইরে থাকার প্রধান কারণ হিসেবে দক্ষ জনবলের অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকে দায়ী করা হয়েছে। স্থায়ী বাজেট ও কারিগরি টেকনিশিয়ান না থাকায় কোথাও কোথাও সাধারণ কর্মীদের দিয়ে প্লান্ট চালানো হচ্ছে। ফলে সীমিত কারিগরি জ্ঞানে দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি প্লান্ট চালানো সম্ভব হচ্ছে না এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দামি যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইউএনওপিএস-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্থাপিত ২৯টি প্লান্ট বর্তমানে কার্যকর থাকলেও, গত ৩০ সেপ্টেম্বর কারিগরি জনবলের বেতন সহায়তার মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং আগামী ৩১ ডিসেম্বর রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার মেয়াদ শেষ হলে সেগুলোও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আইসিডিডিআরবি-এর বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান জানান, দেশে প্রতিবছর নিউমোনিয়া, অস্ত্রোপচার এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগসহ বিভিন্ন কারণে প্রায় ৭৫ লাখ মানুষের জরুরি চিকিৎসার জন্য অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। তীব্র নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, সড়ক দুর্ঘটনা, ডেঙ্গুসহ নানা জটিল রোগীর জীবন বাঁচাতে নিরবচ্ছিন্ন অক্সিজেন অপরিহার্য।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২ কোটি ৩৮ লাখ ঘনমিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন হলেও উৎপাদন হয় মাত্র ২ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদনেই বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া বড় হাসপাতালগুলোর চাহিদা অনুযায়ী প্লান্টগুলোর সক্ষমতাও যথেষ্ট নয়।
রংপুর, রাজশাহী ও বগুড়ার মতো বড় হাসপাতালগুলোতে ৫০০ এলপিএম (প্রতি মিনিটে লিটার) সক্ষমতার একটি প্লান্ট দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে একাধিক প্লান্ট বা বড় তরল অক্সিজেনের ব্যাকআপ প্রয়োজন।
সম্মেলনে বেসরকারি অক্সিজেন উৎপাদন ও এর মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৯টি অক্সিজেন প্লান্ট উৎপাদনে থাকলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। অর্থাৎ বেশির ভাগ উৎপাদক প্রতিষ্ঠানই নিয়ন্ত্রক সংস্থার আওতার বাইরে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন জানান, অক্সিজেনের গুণগত মান নিশ্চিত করতে সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বা কার্বন মনোক্সাইডের মতো অমিশ্রণ উপাদানগুলো সঠিক মাত্রায় আছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
সম্মেলনে এই সমস্যা সমাধানে অচল প্লান্টগুলো মেরামত করা, দক্ষ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে ইউএনওপিএস।




