চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিককে রুশ বাহিনীতে নিয়োগ
প্রকাশিত হয়েছে : ৯:৩৭:৩০,অপরাহ্ন ২৭ অক্টোবর ২০২৬ | সংবাদটি 0 View
বেসামরিক বা ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ অন্তত ২৯ দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে জোরপূর্বক ও প্রতারণার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের ইউক্রেন বিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন।
সংস্থাটি বলছে, বিভিন্ন দেশে সক্রিয় আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে এসব বিদেশি নাগরিককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে; যাদের অনেকে নিহত, আহত, বন্দি কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রকাশিত এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সোমবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘের কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে যুক্ত করার ঘটনা তদন্ত করে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রতারণা ও জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপিন্স, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, উজবেকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ রয়েছে।
পাচার ও প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সবাই ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষ; তারা প্রধানত আর্থসামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর। তাদের অর্থনৈতিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়।
বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে যে তথ্য মিলেছে
প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত কমিশন বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে রাশিয়ায় প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত বেশ কিছু ব্যবসায়ী ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণের কথা বলা হয়েছিল। কাগজপত্রে এই ব্যক্তিদের ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেসামরিক হিসেবে দেখানো হলেও, মূলত এর আড়ালেই রুশ বাহিনীতে লোক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছিল।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও এজেন্সির মাধ্যমে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মত পেশায় চাকরির প্রলোভন দেওয়া হত। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেকের ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয়।
এক ভুক্তভোগী বাংলাদেশির স্ত্রী বলেন, “পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে শুধু রুশ ভাষায় লেখা চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় আমার স্বামীকে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি, আর কোনো উপায় ছিল না।”
যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণতি ও পরিবারের স্বজনদের দুর্দশা
জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন বলছে, জোরপূর্বক চুক্তিতে সই করানোর পর দ্রুতই বিদেশি নাগরিকদের অত্যন্ত কম সময়ের সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারিতে বিপজ্জনক দায়িত্বে পাঠানো হয়। ফলে তাদের অনেকেই মারা গেছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।
বর্তমানে এসব ভুক্তভোগীদের পরিবার চরম মানসিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। দালালের টাকা মেটাতে অনেকে সহায়-সম্পত্তি বিক্রি বা ঋণ করেছেন। স্বজনের মৃত্যুর সংবাদ মিললেও লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি; আবার পাচারকারী চক্রগুলোও পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।
মানবপাচার হিসেবে চিহ্নিত ও আন্তর্জাতিক আহ্বান
সংগৃহীত প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত কমিশন স্পষ্ট করে বলেছে, নিয়োগকারী চক্র এবং রুশ কর্তৃপক্ষের উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয়ে সংঘটিত এসব ঘটনা ‘মানবপাচার’ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। কমিশন রাশিয়াকে অবিলম্বে এ ধরনের বিদেশি নিয়োগ বন্ধ করা, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া এবং জড়িত পাচারকারীদের বিচারে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের তাদের দেশে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং মানবপাচার ঠেকাতে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
আগেও সতর্ক করেছিল ব্র্যাক
গত বছর এক গবেষণাতেও প্রতারণার মাধ্যমে বাংলাদেশিদের রাশিয়ার যুদ্ধে পাঠানোর তথ্য দিয়েছিল ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ব্র্যাক বলছে, গত কয়েক বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।
জাতিসংঘের এই সর্বশেষ প্রতিবেদন বিশ্বজুড়ে চক্রের ফাঁদ ও পাচারের আন্তর্জাতিক ভয়াবহ রূপকেই বিশ্বমঞ্চে নতুন করে তুলে ধরল।




