ইরানে নৌ অবরোধ ফেরাল যুক্তরাষ্ট্র, জ্বালানি স্থাপনায় হামলার হুমকি
প্রকাশিত হয়েছে : ১২:৫২:৩৭,অপরাহ্ন ১৫ জুলাই ২০২৬ | সংবাদটি ১ বার পঠিত
ইরানের সব বন্দরে আবারও নৌ অবরোধ কার্যকর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তেহরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে আগামী সপ্তাহে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ওয়াশিংটনের এটি সর্বশেষ বড় পদক্ষেপ।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় আরও হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার সক্ষমতা দুর্বল করতেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর তারা আবারও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে।
কয়েক মাসের সংঘাতের পর গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, নতুন উত্তেজনায় সেটিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “(ইরানের) জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে শেষের জন্য রেখে দিচ্ছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলোতেও হামলা হবে।”
তেহরানকে সতর্ক করে তিনি বলেন, “তারা যদি আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, আগামী সপ্তাহে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু—সবই নিশানা করা হবে।”
তবে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের দৃষ্টিতে বেসামরিক জনগণের জন্য অপরিহার্য স্থাপনায় হামলা করা নিষিদ্ধ। ১৯৪৯ সালের জেনিভা কনভেনশন অনুযায়ী, এ ধরনের স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের পরিপন্থি।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকেরা ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমঝোতায় পৌঁছানোর বার্তা দিয়েছেন।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি অব্যাহত রয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, বুধবার ভোরে তারা জর্ডানের আজরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পেন্টাগনের কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের গুদামে হামলা চালিয়েছে। তবে কুয়েতের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানি ড্রোন প্রতিহত করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি করতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এই সংঘাত ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও চাপ তৈরি করছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালিতে ইরান সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় এক ডজন নাবিক হতাহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তাদের দুটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই হামলায় একজন ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আরও আটজন আহত হন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তাদের সতর্কবার্তা অমান্য করায় দুটি সুপারট্যাংকারে হামলা চালিয়ে সেগুলো অচল করে দেওয়া হয়েছে।
এর জবাবে ইরানে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে মার্কিন হামলায় হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দর আব্বাস ও দক্ষিণাঞ্চলের সিরিক এলাকার কাছে বিস্ফোরণ হয়েছে। এর আগে কেশম দ্বীপেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে সামরিক অভিযান ও অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করে আমাদের আবার আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে পারবে, তাহলে তারা ভুল করছে।”
উত্তেজনার মধ্যে সোমবার ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ট্রানজিট ফি আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে জাতিসংঘের নৌ সংস্থা ও বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসেন তিনি।
এর পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান ট্রাম্প।
ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় যাওয়া-আসা করা জাহাজের ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ মঙ্গলবার রাত ৮টা থেকে আবার কার্যকর হয়েছে। গত জুনে এটি সাময়িকভাবে তুলে নেওয়া হয়েছিল।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের জাহাজ ছাড়া অন্য সব দেশের জন্য হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকবে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শত শত সামরিক বিমান মোতায়েন রয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময় যত গড়াচ্ছে, এই যুদ্ধের প্রতি মার্কিন নাগরিকদের সমর্থন কমছে। নভেম্বরে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে বিষয়টি রাজনৈতিক চাপও তৈরি করছে।
রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, অংশ নেওয়া অর্ধেক মানুষ মনে করেন, এই যুদ্ধে দেওয়া মূল্য সার্থক হয়নি।
সংঘাতের কারণে জ্বালানির দামও বাড়ছে। গত সাত দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ১৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল সতর্ক করেছে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ জ্বালানির সংকট মোকাবিলায় অনেক দেশ ইতোমধ্যে কৌশলগত তেলের মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হচ্ছে। নিহতদের বড় অংশ ইরান ও লেবাননের নাগরিক।
ওয়াশিংটন বলছে, ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে দেওয়া হবে না। তবে তেহরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
ইরানের দাবি, তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে।




