গঙ্গা চুক্তি নবায়নে বিহারের আপত্তি, চাপে বাংলাদেশ
প্রকাশিত হয়েছে : ৭:৪৩:৪২,অপরাহ্ন ২৩ আগস্ট ২০২৬ | সংবাদটি ২ বার পঠিত
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ফরাক্কা ব্যারাজ ও গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে বিহার রাজ্যের উদ্বেগের বিষয়গুলো চুক্তি নবায়নের সময় বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী ও পানিসম্পদমন্ত্রী বিজয় কুমার।
শনিবার তিনি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেছেন, “গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বিহারের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়েছিল। এখন চুক্তি নবায়নের সময় সে বিষয়টি তুলে ধরা হবে।”
টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, শুক্রবার নয়াদিল্লিতে জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী, উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় কুমার চৌধুরী ও জনতা দল-ইউনাইটেডের রাজ্যসভা সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝা।
ভারতের কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং ভারতের পররাষ্ট্র, জলশক্তি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে চলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিহারের এই অবস্থান চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে নতুন করে জটিলতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বৈঠক শেষে বিজয় চৌধুরী বলেন, ‘‘বিহারের দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।
“ফারাক্কা ব্যারাজে আসা বেশিরভাগ পানিই বিহারের ক্যাচমেন্ট এলাকা থেকে আসে। কিন্তু আমাদের রাজ্য খাবার পানি, সেচ ও শিল্পের ব্যবহারের জন্য তার ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে।”
টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে, বৈঠকে নেপালে কোশী ও অন্যান্য নদীর ওপর প্রস্তাবিত উচ্চস্তরের জলাধার ও বাঁধ নির্মাণের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। ২০০৪ সালে নেপালের বিরাটনগরে প্রতিষ্ঠিত জয়েন্ট প্রজেক্ট অফিসে বিহারের প্রতিনিধি রাখারও আশ্বাস দেন জয়শঙ্কর।
এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বিহারের সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পগুলোতে কেন্দ্রীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আটকে থাকা কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেন।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সই হওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। এ চুক্তির আওতায় প্রতিবছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ফরাক্কায় গঙ্গার পানি দুই দেশের মধ্যে ভাগ করা হয়।
চুক্তির প্রথম সংযোজনী অনুযায়ী, ফরাক্কায় পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে ভারত ও বাংলাদেশ সমান ভাগ পায়। প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেকের মধ্যে থাকলে বাংলাদেশ পায় ৩৫ হাজার কিউসেক এবং বাকি পানি ভারত পায়। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পায় এবং বাকি পানি বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ থাকে।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে মে মাসের প্রথম ভাগ পর্যন্ত পালাক্রমে দুই দেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানির নিশ্চয়তাও রয়েছে।
ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে কেবল গঙ্গার পানির জন্যই দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও এখনো কোনো চুক্তি হয়নি, মূলত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধিতার কারণে।
ফলে গঙ্গা চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে বিহারের আপত্তি কীভাবে বিবেচনা করা হবে এবং তা বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত পানির ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে কি না, তা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
চুক্তি নবায়ন না করার দাবি সঞ্জয় ঝার
গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিরোধিতা করে সম্প্রতি সরব হয়েছেন বিহারের ক্ষমতাসীন দল জনতা দল-ইউনাইটেডের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সঞ্জয় ঝা।
তিনি বলেছেন, “১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে ফারাক্কা চুক্তি স্বাক্ষরের সময় বিহারের স্বার্থের কথা মোটেও বিবেচনা করা হয়নি। এখন সময় এসেছে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করার।”
সঞ্জয় ঝা দাবি করেন, গত ৩০ বছর ধরে এই চুক্তির কারণে বিহারের পানির প্রাপ্যতা ‘মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে এবং ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গা সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তার ভাষ্য, ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গার পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। ফলে বন্যার সময় পানি মূল নদীতে না থেকে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি দেওয়ার শর্তের সমালোচনা করে এই জেডিইউ নেতা বলেন, “চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা থেকে বাংলাদেশকে ১,৫০০ কিউমেক পানি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ওই সময়ে বক্সার দিয়ে বিহারে গঙ্গার প্রবাহ থাকে মাত্র ৪০০ কিউমেক।
“এর মানে হল, চুক্তির শর্ত মেটাতে বিহারের অভ্যন্তরীণ নদীগুলো থেকে বাকি ১,১০০ কিউমেক পানি টেনে নেওয়া হচ্ছে। ফলে আমাদের যখন সেচ বা পানের জন্য পানির প্রয়োজন হয়, তখন সেই পানি চুক্তির অধীনে বাংলাদেশে চলে যায়।”
আগামী ২০৫০ সালের জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে বিহারের কৃষি, শিল্প ও খাবার পানির চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান সঞ্জয় ঝা।
তিনি বলেন, “১৯৯৬ সালে যখন চুক্তি হয় তখন লালু প্রসাদ যাদব কংগ্রেসের সমর্থনে ক্ষমতায় ছিলেন এবং বিহারের স্বার্থ তখন বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক চুক্তি করা কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ার হলেও বিহার এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে অবশ্যই আপত্তি তুলবে।”




