দিল্লিতে নজিরবিহীন ছাত্র বিক্ষোভ
প্রকাশিত হয়েছে : ২:০২:৩০,অপরাহ্ন ২১ জুলাই ২০২৬ | সংবাদটি ৩ বার পঠিত
ভারতের নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর ও এর আশপাশে গতকাল সোমবার হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হন। তাদের এমন উপস্থিতিতে পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মীরা রীতিমতো অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
কয়েক স্তরের ব্যারিকেড, তিন হাজারের মতো নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ও ইন্টারনেট সেবা বন্ধের পরও নজিরবিহীন এ ছাত্র বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের বিশাল এ জনস্রোত পৌঁছে যায় সংসদ ভবনের দোরগোড়াতেও। পরে পুলিশ তাদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে এবং লাঠিপেটা করে।
দ্য হিন্দু পত্রিকার একজন প্রতিবেদক জানান, নেতৃত্বহীন’ এই বিক্ষোভকারীরা যন্তর মন্তর থেকে রাইসিনা মার্গ হয়ে সংসদ ভবনের দিকে এগিয়ে যান। এ সময় পুলিশ তাদের তেমন কোনো বাধা দেয়নি। সংসদের দিকে যাওয়ার সব রাস্তা তখন বিক্ষোভকারীতে পরিপূর্ণ ছিল। গতকাল সংসদে বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এদিনই বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে এগোতে থাকেন। একপর্যায়ে সংসদ প্রাঙ্গণ থেকে ১০০ মিটার দূরে বাস আড়াআড়ি করে রেখে পুলিশ তাঁদের আটকানোর চেষ্টা করে।
সাম্প্রতিক নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ শুরু হয়। এর জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদ ভবন ঘেরাওয়ের ডাক দেয় অনলাইনভিত্তিক যুব সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তাদের ডাকে সাড়া দিয়েই এ বিশাল জনতা জড়ো হয়েছিল।
এর আগে বিক্ষোভের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে যন্তর মন্তরে অনশন শুরু করেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ১৮ জুলাই ভোরে সেখান থেকে পুলিশ তাকে জোর করে তুলে দেয়। ২০ দিন ধরে অনশন করছিলেন তিনি। এ ঘটনা সম্ভবত বিক্ষোভে নতুন মাত্রা যোগ করে। তার প্রতি সংহতি জানিয়ে শত শত মানুষ এ আন্দোলনে যোগ দিতে শুরু করেন।
সংসদের ভেতরেও এনডিএ সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে একটি বৈঠক প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে।
গত রোববার সন্ধ্যায় গোয়েন্দা সূত্রগুলো সরকারকে জানায়, বিক্ষোভস্থলে লোকসমাগম বাড়ছে। এরপরই নয়াদিল্লির উপ–পুলিশ কমিশনার (ডিসিপি) শচীন শর্মার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সিজেপি সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কেন্দ্রীয় সরকার।
সিজেপি সদস্য সৌরভ দাস বলেন, রোববার সন্ধ্যায় ডিসিপি প্রথমে আমাদের কাছে আসেন। তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে আমাদের বৈঠকের প্রস্তাব দেন।
সৌরভ দাস আরও বলেন, আমরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করি। এরপর আজ সকালে তারা একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী এবং পরে একজন কেন্দ্রীয় সচিবের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দেন। আমরা তা–ও নাকচ করি।
তখন ডিসিপি জানতে চান, আমরা আসলে কী চাই। আমরা জানাই, আমাদের একটি প্রতিনিধিদল শুধু কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের সঙ্গেই দেখা করবে। এরপর তারা সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নামের একটি তালিকা চান। পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আমাদের সঙ্গে দেখা করেছেন।
বিক্ষোভের তীব্রতা দেখে ও আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় সরকার নড়েচড়ে বসে। সিজেপি সদস্যদের সঙ্গে আলোচনার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাড্ডাকে দায়িত্ব দেয়।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মন্ত্রী বলেন, আজ সকালে প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব আসে। বেলা ১১টা ৫০ মিনিট থেকে আমাদের আলোচনা চলছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, খুব সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বৈঠক হয়েছে। তাঁদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে প্রথমে বিস্তারিত মৌখিক আলোচনা হয়। পরে বিকেলে তারা একটি লিখিত আবেদন জমা দেন। আমি বিক্ষোভকারীদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানিয়েছি। একই সঙ্গে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসনকে সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছি।
সংসদের ভেতরেও এনডিএ সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা দফায় দফায় রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের মধ্যে একটি বৈঠক প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে চলে।
বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবাদিকদের কিছু জানানো হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও এর জেরে চলমান বিক্ষোভ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালও অল্প সময়ের জন্য অমিত শাহর সঙ্গে দেখা করেন। তবে একই বিষয়ে তাঁদের মধ্যে কথা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সরকারি এক কর্মকর্তা দ্য হিন্দুকে বলেন, বিক্ষোভকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ না করতে পুলিশকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা যখন ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ ভবনের দিকে এগোতে থাকেন, তখন পুলিশ প্রথমে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। পরে লাঠিপেটা করে। এ সময় বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী ও পুলিশ সদস্য আহত হন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর মদদে বিক্ষোভস্থলে বিপুলসংখ্যক লোক জড়ো হয়েছিলেন। এর মধ্যে চন্দ্রশেখর আজাদের আজাদ সমাজ পার্টি (কাশিরাম), আম আদমি পার্টি ও সমাজবাদী পার্টি রয়েছে।
কর্মকর্তা আরও বলেন, বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী দিল্লির বাইরে থেকে এসেছিলেন। বিশেষ করে রাজস্থান থেকে বিপুল মানুষ অংশ নেন।
গতকাল সকালে উত্তর প্রদেশের আজমগড় থেকে আসেন পুলিশে চাকরিপ্রত্যাশী নীতীশ।
তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। কীভাবে তিনি সংসদের এত কাছাকাছি পৌঁছালেন এবং পুলিশ তাদের বাধা দিয়েছিল কি না, জানতে চাইলে বলেন, প্রথম ব্যারিকেড ভাঙার পর আমরা শুধু হেঁটেই গেছি। কেউ আমাদের আটকায়নি।




