যৎসামান্য জয় নিয়ে চীন ছাড়লেন ট্রাম্প
প্রকাশিত হয়েছে : ১১:২৪:১৫,অপরাহ্ন ১৫ মে ২০২৬ | সংবাদটি 0 View
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার দুইদিনের সফর শেষে চীন ছাড়ার সময় এমন কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে গর্ব করেছেন, যা বিনিয়োগকারীদের খুব একটা খুশি করতে পারেনি। এদিকে একই সফরে বেইজিং ওয়াশিংটনকে তাইওয়ান নিয়ে ‘ভুল করার’ ব্যাপারে সতর্কবার্তা যেমন দিয়েছে, তেমনি ইরানে যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু করাই ঠিক হয়নি তাও বুঝিয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের মাটিতে প্রায় এক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের পা পড়ল। এর আগে সর্বশেষ ২০১৭ সালে ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট হিসেবে এশিয়ার দেশটিতে গিয়েছিলেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে পড়তে থাকা জনসমর্থন কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প এবারের চীন সফরে যান।
জাঁকজমকে ভরা তার এ সফরে চীনা সেনাদের কুশলী পদচারণায় মুখরিত উষ্ণ অভ্যর্থনা থেকে শুরু করে বিলাবহুল ভোজসভা, গোপন বাগান ঘুরে দেখাসহ সবই হয়েছে। ট্রাম্পও তার মন্তব্যে বারবারই আয়োজকদের ভূয়সী প্রশংসায় ভাসিয়েছেন।
এটা এক অসাধারণ সফর। এটা থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে এসেছে বলে আমি মনে করি, ঝোংনানহাই কমপ্লেক্সে শেষ বৈঠক শেষে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে এমনটাই বলেছেন ট্রাম্প।
ঝোংনানহাইয়ের এ কমপ্লেক্স একসময় রাজকীয় বাগান ছিল, এখন সেটি চীনা নেতাদের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ বাগানে বিদেশি অতিথিদের নিয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশ বিরল।
বৈঠক শেষে দুই প্রেসিডেন্ট লবস্টার বল ও কুং পাও স্ক্যালপসসহ নানান খাবারে আহার সারেন।
শুক্রবারের এ বৈঠকের আগে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতিটি দিয়েছিল তাতে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে সুস্পষ্ট হতাশা প্রকাশ পেয়েছিল।
কখনোই হওয়া উচিত ছিল না যে সংঘাত, তা অব্যাহত রাখার কোনো কারণ থাকতে পারে না, বলেছে তারা। সঙ্গে এও বলেছে, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করা এ যুদ্ধ বন্ধে একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টায় চীন সহায়তা করছে।
ঝোংনানহাইয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ও শি ইরান নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং এ প্রসঙ্গে তাদের অনুভূতি ‘খুব কাছাকাছি’ ধরনের। তবে শি এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেননি।
এবারের সফরে ট্রাম্প ইরানকে চুক্তিতে রাজি করাতে চীনের সহায়তা চাইতে পারেন বলে বিশ্লেষকরা আগেই ধারণা দিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্পের এ আহ্বানেও যে খুব একটা কাজ হবে না সে বিষয়েও প্রায় নিশ্চিত ছিলেন তারা।
তাদের মতে, মার্কিন আধিপত্যবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান বিবেচনায় তেহরানকে চাপ দিতে বেইজিংয়ের খুব বেশি আগ্রহ থাকার কথা নয়।
যদিও ট্রাম্প শি-র সঙ্গে প্রথমদিনের বৈঠক শেষে ফক্স নিউজের শন হ্যানিটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চীন ইরানে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ বন্ধে রাজি হয়েছে বলে দাবি করেছেন।
বেইজিংয়ের দিক থেকে এখনও এ বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।
বৃহস্পতিবারের আলোচনা নিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সংক্ষিপ্ত ভাষ্য বলছে, ইরানলাগোয়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে ট্রাম্প ও শি ‘যৌথ আকাঙ্ক্ষা’ ব্যক্ত করেছেন। সঙ্কীর্ণ ওই জলপথ দিয়েই যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস গন্তব্যে যেত।
পশ্চিম এশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে শি যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনার ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছেন তাও ওই ভাষ্যে উঠে এসেছে।
উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, ইরান বিষয়ে কিছু করার বিষয়ে চীনের কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি, বলেছেন ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বৈদেশিক নীতি বিষয়ক ফেলো প্যাট্রিসিয়া কিম।
চীনে কৃষিপণ্য বিক্রির ব্যাপারে চুক্তি এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া ঠিক করার বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। দুই দেশ শিগগিরই তিন হাজার কোটি ডলারের অ-সংবেদনশীল পণ্য ঠিক করবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
এসব চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। এনভিডিয়া’র প্রধান নির্বাহী জেনসেন হোয়াং শেষ মুহূর্তে ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হলেও চীনে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির অত্যাধুনিক এইচ২০০ এআই চিপ বিক্রির ব্যাপারে কোনো সমঝোতার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, চীন ২০০টি বোয়িং জেট কিনতে রাজি হয়েছে। সেটা হলে প্রায় এক দশকের মধ্যে প্রথমবার বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাণিজ্যিক বিমান কিনতে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ সফরে চীন ৫০০-র মতো বোয়িং জেট কিনবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল। সে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ট্রাম্পের ঘোষণার পর বোয়িংয়ের শেয়ারমূল্য ৪% পড়ে যায় বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনীতির কাণ্ডারিদের মধ্যে হওয়া শীর্ষ সম্মেলন বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার মতো তেমন কোনো চুক্তি উপহার দিতে ব্যর্থ হওয়ায় শুক্রবার চীনের শেয়ার বাজারেও দরপতন দেখা গেছে।
রয়টার্স লিখেছে, এবারের এ সম্মেলনের মূল অর্জন সম্ভবত গত অক্টোবরে দুই নেতার শেষ সাক্ষাতে হওয়া ‘ভঙ্গুর’ বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল থাকা। ওই চুক্তির কল্যাণে ট্রাম্প চীনা পণ্য আমদানিতে তিন অঙ্কের ঘরে থাকা শুল্ক স্থগিত রাখতে রাজি হন, অন্যদিকে শি-ও বিরল খনিজ সরবরাহে বাধা কঠোর করার পথ থেকে সরে আসেন।
ওই চুক্তির মেয়াদ এ বছরের পরের দিকে শেষ হওয়ার কথা; মেয়াদ বাড়বে কিনা সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে শুক্রবার ব্লুমবার্গ টিভিকে বলেছেন সফরে ট্রাম্পের সঙ্গী হওয়া মার্কিন বাণিজ্য দূত জেমিসন গ্রির।
দুই নেতার বৈঠক মোটাদাগে বন্ধুত্বপূর্ণ ও স্বস্তির হলেও শি তাইওয়ান নিয়ে ‘ভুলভাল কিছু করার’ বিষয়ে ট্রাম্পকে সাবধান করতে ভুলে যাননি।
স্বশাসিত এ দ্বীপটিকে চীন তার নিজের অংশ মনে করে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন তাইপেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম দিতে নিজেদের আইনেই বাধ্য।
চীন উপকূল থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এ তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সম্পর্কে অন্যতম ‘গলার কাঁটা’।
“এখন অবধি তাইওয়ান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে। চীনারা সবসময় এ প্রসঙ্গটি তোলে, আমরাও সবসময় আমাদের অবস্থান স্পষ্টভাবে বলি, এরপর অন্য প্রসঙ্গে চলে যাই,” এনবিসি নিউজকে এমনটাই বলেছেন প্রেসিডেন্টের সঙ্গী হয়ে চীন যাওয়া মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমর্থন ব্যক্ত করায় শুক্রবার তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিন চিয়া-লুং ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদও দিয়েছেন। রুবিও বলেছেন, শি’র সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প হংকংয়ের চীনবিরোধী মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইয়ের প্রসঙ্গও তুলেছেন।
জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক মামলায় ফেব্রুয়ারিতে হংকংয়ের আদালত লাই’কে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।
এর আগে লাই প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছিল, হংকং চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়। লাই তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযাগ অস্বীকার করে আসছেন।
দুই নেতা খুব বেশি চুক্তিতে উপনীত না হলেও উভয়েই সম্পর্কের ‘স্থিতিশীল ভিত্তি’ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন; শি একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক হিসেবে অভিহিতও করেছেন।
আমাদের অবশ্যই একে কাজে লাগাতে হবে এবং কখনোই ভণ্ডুল করা যাবে না, বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় এমটাই বলেছেন চীনা প্রেসিডেন্ট।




